টানেলিং ব্যাপারটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি অন্যতম অদ্ভুত ঘটনা। ধর তুমি লোহার দেওয়ালে একটি পাথর নিক্ষেপ করলে। (যদি তুমি বাটুল দি গ্রেট না হও) তবে ক্লাসিকাল মেকানিক্স অনুসারে পাথরটি অবশ্যই দেওয়ালে ঢাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু কোয়ান্টাম ওয়ার্ল্ডে তুমি পিলে জ্বরে ভোগা ও রোজ পেঁপে দিয়ে শিঙি মাছের ঝোল খাওয়া পটলডাঙ্গার পটলা হলেও তোমার ছোড়া ঢিল লোহার দেওয়ালের অপর পাশে পৌছে যেতে পারে (সে তুমি যত আস্তেই ঢিল ছোড় না কেন)। এটাই টানেলিং। এবারে আমরা আরও গভীরে গিয়ে ব্যাপারটি বোঝার চেষ্টা করব। তোমরা দেখেছো যে যদি পোটেনশিয়াল স্টেপের উচ্চতার থেকে কম শক্তি সম্পন্ন কোন কণা স্টেপের উপর আপতিত হয়, তবে স্টেপের অপর পাশেও এক্সপোনেনশিয়ালি ক্ষয়িষ্ণু ওয়েভ ফাংশন তৈরী হয়।

আলোর আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনের ক্ষেত্রেও সেই একই রকম ঘটনা ঘটে। যেমন কাচ থেকে যদি আলো বায়ুতে প্রবেশ করে এবং যদি আলোর আপতন কোণ কাচ ও বায়ুর সংকট কোনের থেকে বেশি হয় তবে আলো কাচ ও বায়ুর সংযোগতল থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হবে। এর সাথে সাথে একটি এক্সপোনেনশিয়ালি ক্ষয়িষ্ণু তড়িৎ-চূম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরী হবে বায়ুর মধ্যে যাকে ইভানেসেন্ট ওয়েভ বলা হয়। যদি অন্য একটি কাচের প্লেটকে প্রথম কাচের প্লেটের সমান্তরালে বায়ুর মধ্যে রাখা হয় (প্রথম প্লেটের কাছে কিন্তু ওটাকে স্পর্ষ না করে) তবে ইভানেসেন্ট ওয়েভ এই দ্বিতীয় কাচের প্লেটে প্রবেশ করে তাতে আলোক তরঙ্গ তৈরী করবে। এই ঘটনাকে বলা হয় ইভানেসেন্ট ওয়েভ কাপলিং (evanescent wave coupling)। এটাও টানেলিংয়ের একটি উদাহরণ। এখানে দুটি প্লেটের মধ্যেকার বাতাস পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের (বাধা) কাজ করে। একইভাবে যদি পোটেনশিয়াল স্টেপের প্রস্থ সসীম (এবং ছোট) হয় তবে সেটা পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারে পর্যবসিত হয় এবং ওর মধ্যেকার এক্সপোনেনশিয়ালি ক্ষয়িষ্ণু (বা বর্ধিষ্ণু, কেন তা একটু পরেই দেখতে পাবে) ওয়েভ ফাংশন ব্যারিয়ারের বাইরে অপর পাশে চলমান তরঙ্গ উৎপন্ন করতে পারে; অর্থাৎ কণাটি বাধার অপর পাশে পৌছে যাবে। চল এবারে অংক করা যাক। ১ নং চিত্রে একটি পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ার দেখানো হয়েছে। ওই চিত্রে I ও III -নং অঞ্চলে পোটেনশিয়াল শূন্য কিন্তু II -নং অঞ্চলে পোটেনশিয়াল । ছবিটা দেখেই আশা করি বুঝতে পারছ এইরকম পোটেনশিয়ালকে কেন ব্যারিয়ার বলা হয়। তুমি হয়ত রাস্তা দিয়ে যাচ্ছ; হঠাৎ দেখলে রাস্তার মাঝখানে একটি খাড়া পাহাড়! সেটাকে কি বলবে? বাধা তো? এটাও সেরকম। পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারকে গাণিতিক ভাষায় এভাবে লেখা হয়,
হল পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের প্রস্থ। নাও এবারে চটপট এই তিনটি অঞ্চলের জন্য শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ লিখে ফেল। মনে রাখবে যে কণার শক্তি
,
থেকে কম।
I -নং অঞ্চলে
(1a)
II -নং অঞ্চলে
(1b)
III -নং অঞ্চলে
(1c)
যদি আগের পোষ্টগুলি দেখে থাক তবে সহজেই এই সমীকরণত্রয়ের সমাধান সহজেই লিখে ফেলেতে পারবে। (বুঝতে অসুবিধা হলে ওই প্রবন্ধগুলি দেখে নাও।)
(2a)
(2b)
(2c)
যেখানে আগের মতই ও
। এখানে কয়েকটি জিনিস উল্লেখযোগ্য। II -নং অঞ্চলে
তে কি হবে সেটা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাতে হচ্ছে না, তাই
তে
(বর্ধিষ্ণু) ও
(ক্ষয়িষ্ণু) দুটি পদই আছে। আমরা আগের মত এক্ষেত্রেও ধরে নিয়েছি যে কণাটির ওয়েভ I -নং অঞ্চল থেকে এসে ব্যারিয়ারের উপর আপতিত হচ্ছে।
এর দ্বিতীয় পদটি I ও II -নং অঞ্চলের সংযোগতল থেকে প্রতিফলিত ওয়েভ। III নং অঞ্চলে যেহেতু কোন প্রতিফলিত (বা ডানদিক থেকে বাদিকে চলমান) তরঙ্গ নেই তাই সেখানে কেবল
পদটিই রয়ে গেছে। এবারে আমরা ওয়েভ ফাংশনগুলির উপর বাউন্ডারী কন্ডিশন প্রয়োগ করব। মনে আছে তো বাউন্ডারী কন্ডিশনগুলো? নাহলে পূরানো পোষ্ট দেখ।
তে বাউন্ডারী কন্ডিশন প্রয়োগ করে,
(3a)
(3b)
তে বাউন্ডারী কন্ডিশন প্রয়োগ করে,
(3c)
(3d)
সুতরাং আমাদের কাছে এখন ৫ টি অজানা রাশি ও চারটি সমীকরণ আছে। (3a) ও (3b) কে যথাক্রমে যোগ ও বিয়োগ করে পাওয়া যায়,
(4a)
(4b)
একইভাবে (3c) ও (3d) থেকে পাওয়া যায়,
(4c)
(4d)
(4c) ও (4d) থেকে ও
এর মান (4a) ও (4b) তে বসিয়ে,
(5a)
(5b)
তোমরা জানো যে প্রবাবিলিটি কারেন্ট ডেনসিটি
যেহেতু আপতিত ওয়েভ , সুতরাং আপতিত প্রবাবিলিটি কারেন্ট ডেনসিটি (
) হল
(5a)
একইভাবে,
(5b)
(5c)
সুতরাং ট্রান্সমিশন কোফিসিয়েন্ট (transmission coefficient),
যেহেতু,
সুতরাং,
ও
এর মান বসিয়ে,
(6)
এই ট্রান্সমিশন কোফিসিয়েন্টকে টানিলং প্রবাবিলিটি বলা হয়। একইভাবে প্রতিফলন কোফিসিয়েন্টও গণনা করা যেতে পারে। (6) নং সমীকরণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে কণাটির শক্তি ব্যারিয়ারের উচ্চতা থেকে কম হলেও কণাটির ব্যারিয়ার পার হয়ে যাওয়ার সসীম সম্ভাবনা থাকে। আগেই বলে রেখেছি যে এই ঘটনাকেই কোয়ান্টাম টানেলিং বলা হয়। পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের মধ্যে দিয়ে পার হয়ে যাওয়ার প্রবাবিলিটি কণার শক্তি এবং ব্যারিয়ারের প্রস্থ (
) ও উচ্চতার
এর উপর নির্ভর করে। কণার শক্তি(
),
থেকে যত কমতে থাকে টানেলিং প্রবাবিলিটিও তত কমতে থাকে। একইভাবে পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের উচ্চতা কিংবা প্রস্থ বেড়ে গেলেও টানেলিং প্রবাবিলিটি কমে যায়।

উপরের ২ নং চিত্রে পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়েভ ফাংশনের রীয়েল পার্ট দেখানো হয়েছে। লক্ষ্য কর যে বাউন্ডারিগুলোতে ওয়েভ ফাংশন কন্টিনিউয়াস। মনে রাখবে ব্যারিয়ারের বাদিকে মোট ওয়েভ ফাংশন কিন্তু আপতিত ও প্রতিফলিত তরঙ্গের উপরিপাতের ফলে সৃষ্ট তরঙ্গ। যদি ওয়েভ ফাংশনের সময়ের উপর নির্ভরতা হিসেবের মধ্যে ধরা হয় তবে দেখা যায় যে ব্যারিয়ারের বাদিকে মোট ওয়েভ ফাংশনের রীয়েল ও ইমাজিনারী পার্টের বিস্তার সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় (আপতিত ও প্রতিফলিত তরঙ্গের উপরিপাতের দরুন)। অপরপক্ষে ব্যারিয়ারের ডানদিকে ট্রান্সমিটেড ওয়েভের বিস্তার সময়ের উপর নির্ভর করেনা। সময় অনির্ভর শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণের সমাধান মূলত স্টেশনারী স্টেট প্রকাশ করে তাই ব্যারিয়ারের দুদিকেই প্রবাবিলিটি কিন্তু সময়ের উপর নির্ভরশীল নয়। আবার যেহেতু , অর্থাৎ ট্রান্সমিটেড ওয়েভের বিস্তার বা amplitude আপতিত ওয়েভের বিস্তারের থেকে কম হয়, তাই সবসময়ই
। এর পরের পোষ্ট টানেলিং এর কিছু উদাহরণ দেব।
[বিঃদ্রঃ – যদি আমরা ধরে নেই যে কণার শক্তি ব্যারিয়ারের উচ্চতার থেকে বেশি, অর্থাৎ , তবে
, যেখানে
, হল একটি রীয়েল সংখ্যা। এই ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশন গুণাঙ্ক
(7)
যদি হয় তবে
। এই ঘটনাকে বলা হয় রেজোনেন্ট ট্রান্সমিশন। এই ক্ষেত্রে ব্যারিয়ারের দুটো কিনারা বা বাউন্ডারী থেকে প্রতিফলিত তরঙ্গের ব্যাতিচার বা ইনটারফেরেন্সের ফলে মোট প্রতিফলিত তরঙ্গের বিস্তার শূন্য হয়। যার দরুন
ও
হয়।
-এর অন্যান্য মনের জন্য অবশ্য
ও
। অর্থাৎ কণার শক্তি পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের উচ্চতার থেকে বেশি হলে ট্রান্সমিশন গুণাঙ্ক কণার শক্তির সাথে অসিলেট করে বা আন্দোলিত হয়।]
আজ এ পর্যন্তই রইল।