টানেলিং- কয়েকটি উদাহরণ

আজ টানেলিংয়ের কয়েকটি উদাহরণ দেব। এর থেকে বুঝতে পারবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই উদ্ভট তত্ত্বের ব্যাবহারিক প্রয়োগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম উদাহরণ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। দেখা গেছে যে কিছু কিছু তেজস্ক্রিয় মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস স্বতপ্রণোদিত ভাবে একটি আলফা কণা (হিলিয়াম নিউক্লিয়াস ^4_2text{He}) নির্গত করে অপাক্ষাকৃত কম ভর সংখ্যা (চার কম) ও পারমাণবিক সংখ্যা (দুই কম) বিশিষ্ট একটি নতুন নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। যেমন ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস ^{238}_{92}text U থেকে একটি আলফা কণা বিকিরীত হলে সেটা থোরিয়াম নিউক্লিয়াসে (^{234}_{90}text {Th}) পর্যবসিত হয়।

^{238}_{92} text {U} to ^{234}_{90}text{Th} + ^4_2text{He}

এই ঘটনাকে বলা হয় আলফা decay (ক্ষয়) এবং এর জন্য দায়ী কোয়ান্টাম টানেলিং। পরমাণুর কেন্দ্রে আলফা কণা স্ট্রং ফোর্স (strong force) বা বলের প্রভাবে একটি পোটেনশিয়াল ওয়েলের (attractive potential well) মধ্যে থাকে যার গভীরতা প্রায় -40 MeV ও ব্যাসার্ধ (R) প্রায় 8.7times 10^{-15} m। যেহেতু আলফা কণার আধান বা চার্জ ধনাত্মক, তাই নিউক্লিয়াসের বাইরে গেলেই ওটা ধনাত্মক নিউক্লিয়াসের দরুন কূলম্বীয় বিকর্ষণ বল অনুভব করে। অর্থাৎ নিউক্লিয়াসের বাইরে কেন্দ্র থেকে r দূরে পোটেনশিয়াল 2Ze^2/r, যেখানে 2 হল আলফা কণার চার্জ ও Ze নিউক্লিয়াসের চার্জ। ১ নং চিত্রে এই পোটেনশিয়ালের ছবি একে দেখানো হয়েছে। ছবিটি থেকে বুঝতেই পারছো যে নিউক্লিয়াসের বাইরে যেতে গেলে আলফা কণাকে ওই কূলম্বীয় পোটেনশিয়ালের মধ্যে দিয়েই যেতে হবে। যেহেতু দেখা গেছে যে আলফা কণার শক্তি (E) নিউক্লিয়াসের ঠিক বাইরের কূলম্ব পোটেনশিয়ালের মানের (V_0 = 2Ze^2/R) থেকে কম, তাই আলফা কণার পক্ষে নিউক্লিয়াসের বাইরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা হল ওই কূলম্ব পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের মধ্যে  দিয়ে টানেলিং। প্রকৃতপক্ষেই দেখা গেছে যে টানেলিং -এর সূত্র ব্যবহার করে আলফা কণা ক্ষয়ের যে হার (rate of \alpha decay) ও নিউক্লিয়াসের গড় লাইফ টাইমের (average life time of \nucleus) যে মান পাওয়া যায় তা বাস্তব পরীক্ষার ফলের সঙ্গে খুব ভালোভাবে মিলে যায়।

barrier for \alpha decay
চিত্র ১ – আলফা কণার জন্য নিউক্লিয়াসের পোটেনশিয়াল।

আরও একটি বিখ্যাত উদাহরণ হল স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ (STM) যা দিয়ে কোন ধাতুর (বা কোন পরিবাহী পদার্থের) পৃষ্ঠতলের এক একটি পরমাণুকে আলাদা আলাদা ভাবে দেখা যায়। এই মাক্রোস্কোপে খুব সরু একটি পরিবাহী (electrically conducting) সূচের অগ্রপ্রান্তকে ওই ধাতুর পৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় (স্পর্ষ না করে)। ধাতুর পৃষ্ঠ ও সূচের মধ্যে একটি ভোল্টেজ প্রয়োগ করা থাকে। যেহেতু সূচ থেকে ধাতুর পৃষ্ঠে কারেন্ট প্রবাহ এক্ষেত্রে শুধুমাত্র তাদের মধ্যেকার শূন্যস্থানের (বা বায়ুর) মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রন টানেলিং এর মাধ্যমেই সম্ভব এবং যেহেতু টানেলিং প্রবাবিলিটি সূচের অগ্রপ্রান্ত ও ধাতুর পৃষ্ঠের মধ্যের দূরত্বের উপর নির্ভর করে, তাই যখন সূচের অগ্রপ্রান্ত ধাতুর পৃষ্ঠতলের কোন পরমাণুর (যা ইলেকট্রনের উৎস রূপে কাজ করে) কাছে আসে তখন টানেলিং কারেন্টের মান বেরে যায় এবং যখন দুটি পরমাণুর মধ্যবর্তী ফাকা স্থানে থাকে তখন টানেলিং কারন্টের মান কমে যায়। অর্থাৎ সূচের অগ্রপ্রান্তের অবস্থানের সঙ্গে টানেলিং কারেন্টের গ্রাফ আকলে তা থেকে খুব নিখুঁত ভাবে ধাতুর পৃষ্ঠে পরমাণুর বিন্যাস যানা যায়। ২ নং চিত্রে একটি সরলীকৃত STM এর কার্যপ্রণালী দেখানো হয়েছে। এই চিত্রে কালো বল গুলো পৃষ্ঠতলের পরমাণু।

STM
চিত্র ২ – STM এর কার্যপ্রণালী।

ফিল্ড এমিশন টানেলিং এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ। তোমরা জানো যে কোন ধাতুর (বা যেকোন পদার্থের) মধ্যে থেকে ইলেকট্রনকে বাইরে বের করতে হলে (মানে vacuum level এ নিয়ে যেতে হলে) একটি নির্দিষ্ট পরিমান শক্তি খরচ করতে হয় যাকে ওই ধাতুর ওয়ার্ক ফাংশন বলা হয়। অর্থাৎ ইলেকট্রনের জন্য ধাতুর মধ্যবর্তী স্থান একটি পোটেনশিয়াল ওয়েল (৩ নং চিত্রে সবুজ রঙ দিয়ে ওই ওয়েলে অবস্থিত ইলেকট্রন বোঝানো হয়েছে) এবং বাইরে থেকে শক্তি প্রয়োগ না করলে ইলকট্রন ওর বাইরে যেতে পারেনা। কিন্তু যদি ওই ধাতুর পৃষ্ঠতল ও তার বাইরের কোন তড়িৎদ্বারের (electrode) মাঝে একটি ইলেকট্রিক ফিল্ড প্রয়োগ করা তবে তবে, ৩ নং চিত্রে যেমন দেখানো হয়েছে , তেমন ভাবে vacuum level বে৺কে যায়। এর ফলে ধাতুর বাইরে ইলেকট্রনের জন্য একটি ত্রিভূজাকৃতি পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ার তৈরী হয় যার মধ্যে দিয়ে (ধাতুর ফার্মি লেভেল থেকে) ইলেকট্রন টানেলিং হতে পারে। এইভাবে একটি বাইরে থেকে প্রযুক্ত ইলেকট্রিক ফিল্ডের প্রভাবে কোন পদার্থ থেকে কোয়ান্টাম টানেলিং -এর দ্বারা ইলেকট্রনের নির্গমনকে ফিল্ড এমিশন বলা হয়। ছবিটিতে E_F হল ওই ধাতুর মধ্যে ইলেকট্রনের ফার্মি লেভেল। বিভিন্ন ব্যবহারিক ক্ষেত্র যেমন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ, ফিল্ড এমিশন ডিসপ্লে স্ক্রীন, ইলেকট্রন গান ইত্যাদিতে ইলেকট্রনের উৎস রূপে ফিল্ড এমিশন ব্যবহার করা হয়।

field emission
চিত্র ৩ – টানেলিং এর মাধ্যমে ফিল্ড এমিশন।

টানেলিং এর আরও কয়েকটি ব্যবহারিক প্রয়োগের উদাহরণ হল টানেল ডায়োড, রেসোনেন্ট টানেলিং ডায়োড, টানেল ফিল্ড এফেক্ট ট্রানসিস্টর, জোসেফসন জাংকশন ইত্যাদি। তাহলে দেখতেই পাচ্ছো যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই অদ্ভুত পরিণামের ব্যবহারিক প্রয়োগ কত ব্যাপক।

আজকের আলোচনা শেষ করার আগে একটি বিষয় তোমাদের বলে রাখতে চাই। টানেলিং এর ক্ষেত্রে আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে কণার শক্তি পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের উচ্চতার থেকে কম। কিন্তু যদি উল্টোটা হয় অর্থাৎ কণার শক্তি ব্যারিয়ারের উচ্চতার থেকে বেশি হয় তবে কি হবে বলতে পার? একটু ইঙ্গিত দিচ্ছি। পোটেনশিয়াল ব্যারিয়ারের ক্ষেত্রে দুটি বাউন্ডারী আছে যেখান থেকে ইলেকট্রনের ওয়েভ প্রতিফলিত হতে পারে। সুতরাং I -নং ও II -নং অঞ্চলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক x অক্ষ -এই দুদিক বরাবর চলমান তরঙ্গ এবং III -নং অঞ্চলে শুধু ধনাত্মক x অক্ষ বরাবর চলমান তরঙ্গ থাকবে। নিজেরা করে দেখ নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.