এই পোস্টে গাউসের সূত্রের কয়েকটি প্রয়োগ সম্মন্ধে আলোচনা করব। প্রথমেই আমরা এই সূত্র ব্যবহার করে দুটো সমকেন্দ্রিক পরিবাহী গোলাকার বলয়ের মাঝের ধারকত্ব (capacitance) নির্ণয় করব। ব্যাপারটি ১ নম্বর ছবিতে দেখানো হয়েছে। দুটি গোলকের ব্যাসার্ধ যথাক্রমে এবং
। মনে কর বাইরের গোলকটি ভূমির সাথে যুক্ত এবং ভেতরের গোলকটিতে
পরিমাণ আধান রাখা আছে। তাহলে স্পষ্টতই বাইরের গোলকের বিভব শূন্য। যদি ভেতরের গোলকের বিভব
এবং ওই দুটি গোলকের মাঝের ধারকত্ব
হয়, তবে ধারকত্বের সংজ্ঞা অনুসারে,
……………………..(1)
এখানে ধারকত্ব সম্মন্ধে একটু বলে রাখা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কোন বস্তুর ধারকত্ব বলতে ওর আধান ধরে রাখার ক্ষমতা বোঝায়। ধর ও
হল দুটি বস্তু এবং ভূমির সাপেক্ষে তাদের দুজনেরই বিভব সমান। যদি এমতাবস্থায়
-এর মোট আধান
-এর মোট আধানের থেকে বেশি হয় তবে বলা হয় যে
-এর ধারকত্ব
অপেক্ষা বেশি। অর্থাৎ সমান বিভবসম্পন্ন দুটি বস্তুর যেটাতে আধান বেশি থাকে তার ধারকত্ব বেশি। তার মানে এটা হল যে বস্তুর ধারকত্ব বেশি হলে সেটাতে কোন প্রদত্ত বিভবের জন্য বেশি আধান জমা করা যেতে পারে। ধারকত্বের এস.আই. একক হল ফ্যরাড। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতিতে ধারক একটি অপরিহার্য বস্তু। ধারক বা ক্যাপাসিটর তৈরি করা হয় সাধারণত নির্দিষ্ট দূরত্বে পরষ্পরের থেকে আলাদা রাখা দুটি পরিবাহী ব্যবহার করে। ওই দুটি পরিবাহীর মাঝে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোন অপরিবাহী পদার্থ রাখা হয় ধারকত্ব বাড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনে। যদি ধারকে এক কুলম্ব আধান প্রয়োগ করলে ওর দুটি প্লেটের মাঝে বিভব পার্থক্য এক ভোল্ট হয় তবে ওই ধারকের ধারকত্ব হল এক ফ্যারাড। তবে ব্যবহারিক ক্ষেত্রের তুলনায় ফ্যারাড হল খুব বড় একটি একক। তাই সাধারণত মাইক্রোফ্যারাড, ন্যানোফ্যারাড বা পিকোফ্যারাড এককে ধারকত্ব লেখা হয়। এবারে আমরা আবার সমকেন্দ্রিক গোলকের আলোচনায় ফিরে যাব।

আমরা ভেতরের গোলকে আধান প্রয়োগ করেছি। ধারকত্ব নির্ণয় করতে গেলে আমাদের এবারে ওই দুটো গোলকের মাঝের বিভব পার্থক্য বের করতে হবে। আর বিভব পার্থক্য বের করতে হলে আমাদের জানা দরকার যে দুটি গোলকের মাঝের কোন বিন্দুতে তড়িৎ ক্ষেত্র কত। তড়িৎ ক্ষেত্র গণনা করবার জন্য আমরা গাউসের সূত্র প্রয়োগ করব। দুটি গোলকের প্রতিসমতা থেকে এটা স্পষ্ট যে ওই দুটি গোলেকের মাঝের যেকোন বিন্দুতে তড়িৎ ক্ষেত্র সর্বদা অরীয় বা রশ্মীয় (radial) প্রকৃতির। তার মানে
ধনাত্মক না ঋণাত্মক তার উপর নির্ভর করে তড়িৎ ক্ষেত্র কেন্দ্রবিমুখি বা কেন্দ্রমুখি হবে। ছবি থেকে আরও বুঝতে পারা যায় যে গোলকের কেন্দ্র থেকে
ব্যাসার্ধের কোন কাল্পনিক একটি গোলাকার তল
কল্পনা করলে সেই তলের প্রতি বিন্দুতে তড়িৎ ক্ষেত্রের মান
সমান হবে (কারণ গোলক দুটির সাপেক্ষে ওই কাল্পনিক তলের উপর অবস্থিত প্রতিটি বিন্দু পরষ্পরের সমতুল্য)। এই তলকে বলা হয় গাউসিয়ান তল। ওই তলের উপর গাউসের সূত্র প্রয়োগ করলে আমরা পাই [লক্ষ্য কর যে কাল্পনিক গাউসিয়ান তল দ্বারা আবদ্ধ অঞ্চলের মোট আধান
],
……………….. (2)
উপরের গণনায় হল একটি কাল্পনিক গাউসিয়ান তলের একটি অতি ক্ষুদ্র অঞ্চল। এই ক্ষুদ্র ক্ষেত্রের অভিমুখ গোলকের কেন্দ্রবিমুখি। অর্থাৎ
ও তড়িৎ ক্ষেত্রের অভিমুখ একই। তাই
। আরও যেহেতু ওই তলের প্রত্যেক বিন্দুতে তড়িৎ ক্ষেত্রের মান সমান, তাই
কে আমরা ইন্টিগ্রেশনের বাইরে নিতে সক্ষম হয়েছি। অতএব গাউসের প্রয়োগ করে আমরা খুব সহজেই দুটি গোলেকের মাঝের কোন বিন্দুতে তড়িৎ ক্ষেত্র নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছি। যদি গাউসের সূত্র ব্যবহার না করে ওই কাজটি করতে যেতে তবে অংকটি অনেকটাই বড় হয়ে যেত। (2) নং সমীকরণ থেকে তড়িৎ ক্ষেত্রের মান পাওয়া যায়। আর আগেই বলেছি যে ওই তড়িৎ ক্ষেত্র গোলকের ব্যাসার্ধ বরাবর অরীয়ভাবে (radially) কাজ করে। এবারে সহজেই আমরা দুটি গোলকের মাঝের বিভব পার্থক্য বের করতে পারি। সেজন্য আমরা নিম্নলিখিত অতিপরিচিত সূত্র ব্যবহার করব।
………………………. (3)
অতএব দুটি গোলকের মধ্যের বিভব পার্থক্য,
…………………. (4)
উপরের গণনায় লক্ষ্য কর যে ইন্টিগ্রেশনের লিমিট থেকে
পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ বাইরের গোলকটির বিভব শূন্য। যাইহোক (1) ও (4) নং সমীকরণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে ওই গোলকসমষ্টির ধারকত্ব,
………………(5)

ও
ব্যাসার্ধবিশিষ্ট লম্বা চোঙ। বাইরের চোঙের বিভব শূন্য এবং ভেতরের চোঙের প্রতি একক দৈর্ঘ্যে
পরিমাণ আধান রয়েছে।
দেখলে তো যে গাউসের সূত্র ব্যবহার করে দুটি সমকেন্দ্রি গোলকের ধারকত্ব নির্ণয় করা কত সহজ। লক্ষ্য কর যে ধারকত্ব গোলকের আধানের উপর নির্ভর করেনা, শুধু গোলক দুটির ব্যাসার্ধের উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে কোন পরিবাহীর ধারকত্ব শুধু ওর জ্যামিতির উপর নির্ভর করে। এবারে আমরা গাউসের সূত্র ব্যবহার করে একই অক্ষবিশিষ্ট দুটি ফাঁপা পরিবাহী সিলিন্ডার বা চোঙের মাঝের ধারকত্ব নির্ণয় করব। ২ নং ছবিতে এরকম দুটি চোঙ দেখানো হয়েছে। মনে কর চোঙ দুটির দৈর্ঘ্য ওদের ব্যাসার্ধদ্বয়
এবং
অপেক্ষা অনেক বড়। মনে কর বাইরের চোঙটি ভূমির সাথে যুক্ত এবং ভেতরের চোঙটিতে প্রতি একক দৈর্ঘ্যে
পরিমাণ আধান রয়েছে। এবারেও প্রথমে আমরা দুটি চোঙের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অক্ষ থেকে
দূরত্বে তড়িৎ ক্ষেত্র নির্ণয় করব। তার জন্য এক্ষেত্রে আমরা চোঙ দুটির মাঝে
ব্যাসার্ধ ও
দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট অপর একটি গাউসিয়ান চোঙ (S) কল্পনা করব। সিস্টেমের প্রতিসমতা থেকে বোঝা যায় যে ওই কাল্পনিক চোঙের বক্রতলের প্রতি বিন্দুতে তড়িৎ ক্ষেত্রের মান সমান হবে এবং তড়িৎ ক্ষেত্র চোঙের ব্যাসার্ধ বরাবর অরীয়ভাবে কাজ করবে। যেহেতু ওই কাল্পনিক গাউসিয়ান চোঙের দ্বারা আবদ্ধ অঞ্চলের মোট আধান হল
, তাই গাউসের সূত্র ব্যবহার করে,
……………..(6)
অতএব দুটি চোঙের মধ্যে বিভব পার্থক্য,
…………………. (7)
উপরের গণনায় লক্ষ্য কর যে ইন্টিগ্রেশনের লিমিট থেকে
পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ বাইরের চোঙের বিভব শূন্য। যাইহোক (1) ও (7) নং সমীকরণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে ওই চোঙ দুটির ধারকত্ব,
………………(8)
অতএব, চোঙ দুটির মাঝে প্রতি একক দৈর্ঘ্যে ধারকত্ব হল,
………………(8)

শেষ করার আগে গাউসের সূত্রের আরও একটি প্রয়োগের কথা বলব। মনে কর একটি তলের দুপাশে 1 ও 2 নং অঞ্চলে তড়িৎ ক্ষেত্র হল যথাক্রমে
এবং
। ছবিতে এটা দেখানো হয়েছে। তলটি স্ক্রীনের সাথে উল্লম্বভাবে অবস্থিত এবং কম্পিউটারের স্ক্রীনের সাথে তলটি প্রস্থচ্ছেদ একটি রেখার মাধ্যেমে ৩ নং ছবিতে দেখানো হয়েছে।
হল একটি একক ভেক্টর যা ওই তলের সাথে উল্লম্বভাবে ছবিতে যেমন দেখানো হয়েছে তেমনভাবে অবস্থিত।
তলের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে
পরিমাণ আধান রয়েছে। আমরা গাউসের সূত্র প্রয়োগ করে
এবং
এর ভেতর সম্পর্ক নির্ণয় করব। সে জন্য আমাদের প্রয়োজন একটি গাউসিয়ান তল। ছবিটিতে একটি ছোট্ট চোঙের আকারের গাউসিয়ান তল দেখানো হয়েছে। এইরকম গাউসিয়ান তলকে “গাউসিয়ান পিলবক্স” বলা হয়। ওই “পিলবক্সের” প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল
এবং ওর দৈর্ঘ্য এতটাই ক্ষুদ্র যে ওর বক্রতলের ক্ষেত্রফল প্রায় শূন্য [প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের তুলনায়]। এই পিলবক্সের মোট আয়তনের উপর আমরা গাউসের সুত্র প্রয়োগ করব। স্পষ্টতই ওর মধ্যের মোট আধান হল
, কারণ
তলের কেবল
অংশ ওই পিলবক্সের ভেতরে অবস্থিত। যেহেতু পিলবক্সের বক্রতলের ক্ষেত্রফল শূন্য, তাই গাউসের সূত্র প্রয়োগ করে,
…………………..(9)
এখানে হল 1 নং অঞ্চলে অবস্থিত পিলবক্সের বাইরের তল যার মোট ক্ষেত্রফল
। এই তলের অভিমূখ
বরাবর। একইভাবে
হল 2 নং অঞ্চলে অবস্থিত পিলবক্সের বাইরের তল যার মোট ক্ষেত্রফল
। এই তলের অভিমূখ
বরাবর। অতএব (9) নং থেকে,
…………..(10)
এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। লক্ষ্য কর যে এবং
হল যথাক্রমে
এবং
তড়িৎ ক্ষেত্রদ্বয়ের
তলের সাপেক্ষে উল্লম্ব উপাদান। এর অর্থ হল যে যদি কোন তলের প্রতি একক ক্ষেত্রফলের মোট আধান শূন্য না হয় তবে ওই তলের দুপাশে তড়িৎ ক্ষেত্রের উল্লম্ব উপাদান সমান হতে পারেনা।
স্থির তড়িৎ ক্ষেত্র সংক্রান্ত সমস্যায় গাউসের সূত্র প্রয়োগের আরও উদাহরণ এবং ধারকত্ব সম্মন্ধে বিশদে জানার জন্য পরিহার্য একটি বই হল D. J. Griffiths এর লেখা বই, যার লিঙ্ক এখানে দিয়েছি।