ইউনিকনেস তত্ত্ব (uniqueness theorem) এটা নিশ্চিত করে যে কোন প্রদত্ত বাউন্ডারী শর্তের জন্য পোয়াসোঁ সমীকরণের এক এবং অদ্বিতীয় সমাধান থাকবে। মনে কর কোন প্রদত্ত বাউন্ডারী শর্ত ব্যবহার করে তুমি পোয়াসোঁ সমীকরণের একটি সমাধান বের করলে (কিভাবে পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধান করতে হয় সেটা আমরা পরে দেখব)। তাহলে ইউনিকনেস তত্ত্বের সৌজন্যে তুমি এটা নিশ্চিত হতে পার যে ওই প্রদত্ত বাউন্ডারী শর্তের জন্য পোয়াসোঁ সমীকরণের অপর কোন সমাধান থাকতে পারেনা (তার মানে তোমার কাজ কমে গেল)। আরও একটু সাদা বাংলায় বলছি। ধর তোমাকে তোমার ফিজিক্সের শিক্ষক বললেন যে যাও জঙ্গল থেকে সমস্ত আম খুঁজে আন। জঙ্গলে খুঁজতে খুঁজতে তুমি একটি আম পেলে, তারপর তোমাকে আরও খুঁজতে হবে, যদি সেখানে আরও আম থাকে। অপরপক্ষে শিক্ষক মহাশয় যদি বলে দিতেন যে জঙ্গলে একটি মাত্র আমই পড়েছে তবে তোমার কাজ অনেক সহজ হত। কারণ সেক্ষেত্রে প্রথম আমটি পেলেই তুমি খোঁজা বন্ধ করতে পারতে। ইউনিকনেস তত্ত্বের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে। মনে কর দুটি ভিন্ন আধান বিন্যাসের জন্য বাউন্ডারী শর্ত একই। তাহলে ইউনিকনেস তত্ত্ব অনুসারে ওই দুটি ভিন্ন আধান বিন্যাসের জন্য পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধানও একই হবে। এর মধ্যে হতে পারে যে একটি ক্ষেত্রের সমাধান করা খুবই সহজ, অপরটির জটিল। তাহলে সহজ সমস্যাটির সমাধান করে আমরা জটিল সমস্যাটির সমাধানও বের করে ফেলতে পারব। চল এবারে ইউনিকনেস তত্ত্ব প্রমাণ করা যাক। কিন্তু তার আগে আমাদের জানতে হবে বাইন্ডারী শর্ত সম্মন্ধে।
স্থির তড়িৎ ক্ষেত্রে বাউন্ডারীর অর্থ হল এমন কোন রেখা (দ্বিমাত্রায়) বা তল (ত্রিমাত্রায়) যেখানে তড়িৎ বিভব (potential) অথবা তড়িৎ ক্ষেত্রের (field) মান আমাদের জানা রয়েছে এবং যা কোন অঞ্চলকে আবদ্ধ করে রাখে। উদাহরনস্বরূপ একটি ফাঁপা গোলকের কথা বলা যেতে পারে। গোলকের সারফেস বা পৃষ্ঠতলের প্রত্যেক বিন্দুতে বিভবের মান জানা থাকলে সেটা একটা বাউন্ডারী শর্ত বলে গন্য হবে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে বাউন্ডারী শর্তের জন্য কোন বাস্তব বাউন্ডারী থাকা একেবারেই আবশ্যক নয়। কোন অঞ্চলকে আবদ্ধ করে রেখেছে এমন কোন কাল্পনিক রেখা বা তলের প্রত্যেক বিন্দুতে বিভব অথবা ক্ষেত্রের মান জানা থাকলে সেটাও একটি বৈধ বাউন্ডারী শর্ত। যদি বাউন্ডারীতে বিভবের মান প্রদত্ত থাকে তবে তাকে বলা হয় ডিরিকলেট বাউন্ডারী শর্ত (Dirichlet boundary condition)। আর যদি বাউন্ডারীতে তড়িৎ ক্ষেত্রের মান প্রদত্ত থাকে তবে তাকে বলা হয় নিউম্যান বাউন্ডারী শর্ত (Newman boundary condition)। এই দুরকম বাইন্ডারী শর্তের জন্যই পোয়াসোঁ সমীকরণের অদ্বিতীয় সমাধান সম্ভব। এমনকি বাউন্ডারীর কিছু অংশে বিভব এবং বাকি অংশে তড়িৎ ক্ষেত্র দেওয়া থাকলেও পোয়াসোঁ সমীকরণের ইউনিক সমাধান সম্ভব। কিন্তু যদি বাউন্ডারীর প্রতি বিন্দুতেই বিভব ও তড়িৎ ক্ষেত্র দুইয়েরই মান উল্লেখ থাকে তবে তাকে বলা হয় কোশি বাউন্ডারী শর্ত (Cauchy boundary condition) এবং এই ক্ষেত্রে পোয়াসোঁ সমীকরণের এক এবং অদ্বিতীয় সমাধান সম্ভব নয়।
ইউনিকনেস তত্ত্ব
আমরা ডিরিকলেট এবং নিউম্যান বাউন্ডারী শর্তের জন্য ইউনিকনেস তত্ত্ব প্রমাণ করব। যেহেতু আমরা পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধান নিয়ে কথা বলছি তাই পোয়াসোঁ সমীকরণ লিখে শুরু করছি।
………….. (1)
যথারীতি হল
বিন্দুতে বিভব এবং
হল শূন্যস্থানের তড়িৎ-ভেদনযোগ্যতা। আগেই বলেছি যে পোয়াসোঁ সমীকরণ সমাধানের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত বাউন্ডারী শর্ত। প্রথমে আমরা ডিরিকলেট বাউন্ডারী শর্তের জন্য ইউনিকনেস তত্ত্ব সম্মন্ধে আলোচনা করব। অর্থাৎ বাউন্ডারীতে বিভবের মান প্রদত্ত,
……………(2)
আমাদের উদ্দেশ্য হল এটা দেখানো যে এই বাউন্ডারী শর্ত মেনে পোয়াসোঁ সমীকরণের কেবল একটিই সমাধান সম্ভব। তার জন্য আমরা ধরে নেব যে উপরোক্ত সমীকরণের দুটি সমাধান রয়েছে – এবং
। যেহেতু এই দুটি বিভব ফাংশন (1) নং সমীকরণের সমাধাণ এবং একই বাউন্ডারী শর্ত [সমীকরণ (2)] মেনে চলে তাই,
……………(3)
……………(4)
…………….(5)
মনে কর । অতএব (3), (4) ও (5) থেকে,
………………….(6)
………………….(7)
অর্থাৎ ল্যাপলাসের সমীকরণ মেনে চলে এবং বাউন্ডারীতে এর মান শূন্য। (6) ও (7) নং সমীকরণ থেকেই বোঝা যায় যে
। আমরা ব্যাপারটিকে একটু বিস্তারিত করে বলব। সেজন্য আমাদের প্রয়োজন গ্রীনের প্রথম আইডেনটিটি।। যদি
তল দ্বারা আবদ্ধ
অঞ্চলে
এবং
দুটি স্কেলার ফাংশন হয় তবে গ্রীনের প্রথম আইডেনটিটি অনুসারে,
………………..(8)
যদি হয় তবে,
………………..(9)
যেহেতু বাউন্ডারীতে , তাই (9) নং সমীকরণে ডানদিকের পদটি শূন্য। এছাড়াও (6) নং সমীকরণ ব্যবহার করে আমরা পাই,
……………(10)
এই সমীকরণ সিদ্ধ হতে হলে প্রয়োজন । অর্থাৎ
অঞ্চলের সর্বত্র
এর গ্রেডিয়েন্ট শূন্য, যার অর্থ হল এই যে
অঞ্চলের সর্বত্র
স্কেলার ফাংশনের মান একটি ধ্রুবক
।
আবার যেহেতু বাউন্ডারীতে -এর মান শূন্য, তাই
। অতএব
-এর মানও অবশ্যই শূন্য। অর্থাৎ,
…….(11)
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে দুটো সমাধাণ প্রকৃতপক্ষে একই। অর্থাৎ প্রদত্ত ডিরিকলেট বাউন্ডারী শর্তের জন্য পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধান এক এবং অদ্বিতীয়।
এবারে আমরা নিউম্যান বাউন্ডারী শর্ত নিয়ে আলোচনা করব। এই ক্ষেত্রে বাউন্ডারীতে তড়িৎ ক্ষেত্রের মান প্রদত্ত। যেহেতু তড়িৎ ক্ষেত্র মূলত বিভবের গ্রেডিয়েন্ট বা উল্লম্ব ডেরিভেটিভ, তাই বাউন্ডারীতে তড়িৎ বিভবের উল্লম্ব ডেরিভেটিভের মান জানা রয়েছে। অর্থাৎ অংকের ভাষায়,
………………….. (12)
অতএব, ………………….. (13)
তাহলে আগের মতই গ্রীনের প্রথম আইডেনটিটি ব্যবহার করে আমরা পাব,
………………..(9)
এই সমীকরণে (6) এবং (13) নং শর্ত ব্যবহার করে,
……………(10)
বা,
উল্লেখ্য যে এবারে কিন্তু ধ্রুবক এর মান শূন্য নয়। অতএব,
…………..(15)
অর্থাৎ দুটি সমাধানের মাঝের পার্থক্য কেবল একটি ধ্রুবকের সমান। যেহেতু তড়িৎ ক্ষেত্রে মূলত তড়িৎ বিভবের গ্রেডিয়েন্টের সমান, তাই ওই দুটি বিভব বা পোটেনশিয়ালের জন্য তড়িৎ ক্ষেত্র বা ফিল্ড একই থাকবে (ধ্রুবকের গ্রেডিয়েন্ট শূন্য)। অর্থাৎ প্রদত্ত নিউম্যান বাউন্ডারী শর্তের জন্যেও পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধান মূলত এক।
এবারে আলোচ্য বিষয় কোশি বাউন্ডারী শর্ত। এই ক্ষেত্রে বাউন্ডারীর প্রতি বিন্দুতে পোটেনশিয়াল ও ফিল্ড দুইয়েরই মান দেওয়া থাকে। উপরে দেখলে যে বাউন্ডারীতে পোটেনশিয়ালের মান দেওয়া থাকলে পোয়াসোঁ সমীকরনের একটি ইউনিক সমাধান পাওয়া যায়। আবার বাউন্ডারীতে ফিল্ডের মান দেওয়া থাকলেও পোয়াসোঁ সমীকরণের অপর একটি ইউনিক সমাধান সম্ভব। যেহেতু এই দুই ক্ষেত্রের বাউন্ডারী শর্ত একে অন্যের উপর সাধারণভাবে নির্ভর করেনা, তাই ওই দুটি ইউনিক সমাধান পরষ্পরের থেকে আলাদা হবে। মানে ওই দুটি সমাধান একটি অপরটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবেনা। এই জন্যেই বলা হয় যে কোশি বাউন্ডারী শর্তের জন্য পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধান সম্ভব নয়।
References:
1. J. D. Jackson, “Classical Electrodynamics“.
2. D. J. Griffiths,”Introduction to Electrodynamics (4th Edition)“.
3. Wikipedia -তে ইউনিকনেস তত্ত্ব সম্মন্ধে পড়।