পেয়ার প্রোডাকশন

একটি ফোটন থেকে একজোড়া ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার মৌলকণা তৈরি হওয়ার ঘটনাই হল পেয়ার প্রোডাকশন (pair production)। এটা শক্তি ও পদার্থের তুল্যতার একটি বাস্তব উদাহরণ। যেমন পেয়ার প্রোডাকশনের মাধ্যমে উপযুক্ত পরিমাণ শক্তি সম্পন্ন একটি গামা রশ্মি ফোটন থেকে একটি ইলেকট্রন ও পজিট্রন সৃষ্টি হতে পারে। ব্যপারটি বড়ই চিত্তাকর্ষক। ছিল শক্তি, হয়ে গেল পদার্থ। শুধু ইলেকট্রন-পজিট্রন জোড়াই নয়, পেয়ার প্রোডাকশনের মাধ্যমে একটি ফোটন থেকে মিউওন-অ্যান্টিমিউওন, টাউ-অ্যান্টিটাউ ইত্যাদি কণাজোড়ও উৎপন্ন হতে পারে। তবে উল্লেখযোগ্য যে শূন্যস্থানে শুধুমাত্র একটি ফোটন থেকে পেয়ার প্রোডাকশন সম্ভব নয়, কারণ তাহলে ভরবেগ ও ভর-শক্তি সংরক্ষিত থাকেনা (কেন সেটা নিচের অনুচ্ছেদে আলোচনা করছি)। পেয়ার প্রোডাকশন মূখ্যত ঘটে ফোটনের সাথে কোন পরমাণু কেন্দ্রের মিথোষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে ফোটনের সাথে ইলেকট্রন, বা কোন বোসন বা অপর কোন ফোটনের মিথোষ্ক্রিয়ার ফলেও পেয়ার প্রোডাকশন হতে পারে। মনে রাখবে যে পেয়ার প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে ভরবেগ ও শক্তির সংরক্ষণ অতি অবশ্যই প্রযোজ্য। এছাড়াও মোট আধান, লেপ্টন নাম্বার, কৌণিক ভরবেগ ইত্যাদিও সংরক্ষিত থাকতে হবে। যেমন উৎপন্ন ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার মৌলকণা জোড়ের মোট আধান শূন্য হতে হবে, কারণ ফোটনের আধান শূন্য।

ডিরাকের সমূদ্র ও পেয়ার প্রোডাকশন
চিত্র ১ – ডিরাক Sea.

আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে জানা যায় যে m ভরের বস্তুর শক্তি ও ভরবেগ যদি যথাক্রমে E এবং p হয় তবে, E^2 = p^2c^2 +m^2c^4, যেখানে c হল শূন্যস্থানে আলোর বেগ। অতএব বলা যায়,

\displaystyle E = pm sqrt{p^2c^2 +m^2c^4} ……… (1)

এই সমীকরণ ব্যবহার করে ডিরাক যখন তার বিখ্যাত রিলেটিভিস্টিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সমীকরণ তৈরি করলেন তখন স্বভাবতই সমস্যা দেখা দিল যে ইলেকট্রনের শক্তি ধনাত্মক ও ঋণাত্মক দুইই হতে পারে। আরও ভাল করে বললে এই দাড়ায় যে স্পিন 1/2 কণার জন্য ডিরাকের সমীকরণের সমাধান করলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক দু ধরনের শক্তি সম্পন্ন স্টেট পাওয়া যায়। এই স্টেটগুলিকে ১ নম্বর ছবিতে দেখানো হয়েছে। প্রত্যেক E শক্তিসম্পন্ন স্টেটের জন্য একটি করে (-E) শক্তির স্টেট রয়েছে। ধনাত্মক স্টেটের ন্যুনতম শক্তি mc^2 এবং ঋণাত্মক স্টেটের সর্বাধিক শক্তি (-mc^2) এবং ধনাত্মক ও ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন স্টেটগুচ্ছের মাঝে শক্তির পার্থক্য 2mc^2। তার ফলে প্রাথমিক অবস্থায় ধনাত্মক শক্তির স্টেটে থাকলেও কোন ইলেকট্র শক্তি বিকিরণ করতে করতে ধনাত্মক থেকে ক্রমাগত বেশি ঋণাত্মক শক্তি সম্পন্ন স্টেটে পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ ওই ইলেকট্রনের শক্তি সীমাহীনভাবে ক্রমাগত কমতে থাকবে। বলাই বাহুল্য সেটা বাস্তবে হয়না এবং প্রকৃতিতে নির্দিষ্ট শক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রন পাওয়া যায়। এই সমস্যা সমাধান করার জন্য ডিরাক প্রস্তাব করেছিলেন যে শূন্যস্থানে ঋণাত্মক শক্তির সমস্ত স্টেট ইলেকট্রন দিয়ে ভর্তি রয়েছে এবং সমস্ত ধনাত্মক শক্তির স্টেট খালি থাকে। মানে শূন্যস্থান হল মূলত ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রন দিয়ে পূর্ণ। এই ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রন দিয়ে পূর্ণ শূন্যস্থানকে বলা হয় ডিরাকের সমূদ্র বা Dirac sea। তার ফলে পাউলীর নীতি অনুসারে কোন ধনাত্মক শক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রনের পক্ষে ঋণাত্মক শক্তির স্টেটে অবতরণ করা সম্ভব নয়। এই ডিরাক সমূদ্রের থেকেই পেয়ার প্রোডাকশন এবং পজিট্রনের অস্তিত্ব সম্মন্ধে প্রথম ভবিষ্যতবাণী করা হয়। মনে কর ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন একটি ইলেকট্রনকে Dirac sea থেকে ধনাত্মক শক্তির স্টেটে নিয়ে যেতে চাও। তবে স্পষ্টতই ন্যুনতম প্রয়োজনীয় শক্তির মান 2mc^2। এই শক্তি আসতে পারে একটি ফোটন থেকে। অর্থাৎ ন্যুনতম 2mc^2 শক্তিসম্পন্ন একটি ফোটন শোষন করে একটি ইলেকট্রন ঋণাত্মক শক্তির স্টেট থেকে ধনাত্মক শক্তির স্টেটে পৌঁছোতে পারে। এর ফলে Dirac sea -তে ঋণাত্মক শক্তির একটি খালি স্টেট বা “হোল” তৈরি হবে যা মূলত Dirac sea -তে একটি ইলেকট্রন ও কিছুটা ঋণাত্মক শক্তির অনুপস্থিতি। এই ঋণাত্মক শক্তি ও ঋণাত্মক আধানের (ইলেকট্রনের) অনুপস্থিতিকে (হোল) ধনাত্মক আধান ও ধনাত্মক শক্তি বিশিষ্ট কণা হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটা সেমিকন্ডাকটারের ব্যান্ড থিয়োরীর মত। এই ধনাত্মক আধান ও ধনাত্মক শক্তিসম্পন্ন কণাই হল ইলেকট্রনের প্রতিকণা পজিট্রন। এর ফলে আমরা দেখব যে ফোটন থেকে (শূন্যস্থানে) একটি ইলেকট্রন ও পজিট্রন জোড় তৈরি হল। এই ঘটনাই পেয়ার প্রোডাকশন। [তবে এখানে উল্লেখ্য যে বর্তমানে কোয়ান্টান ফিল্ড থিয়োরীতে ডিরাক সমূদ্রের ধারণা একটু সংশোধিত করে ঋণাত্মক শক্তির পূর্ণ ইলেকট্রন স্টেটকে ধনাত্মক শক্তির খালি পজিট্রন স্টেট এবং ঋণাত্মক শক্তির খালি ইলেকট্রন স্টেটকে ধনাত্মক শক্তির পূর্ণ পজিট্রন স্টেট হিসেবে ধরা হয়।] ইলেকট্রন-পজিট্রন পেয়ার প্রোডাকশনকে সমীকরণের আকারে লিখলে,

\gamma to e^- +e^+

যেহেতু ইলেকট্রন – পজিট্রনের ক্ষেত্রে ভর mc^2 = 0.51 MeV, তাই পেয়ার প্রোডাকশনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যুনতম শক্তির মান 2mc^2 = 1.02 MeV। এই শক্তি গামা রশ্মির ফোটনের। পেয়ার প্রোডাকশনের ফলস্বরূপ পদার্থের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় গামা রশ্মির ফোটনের শোষিত হবার মাত্রা ফোটনের শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তে থাকে। শুধু তাই নয় কোন মৌলের মধ্যে পেয়ার প্রোডাকশনের মাত্রা ওই মৌলের পারমাণবিক সংখ্যার বর্গের সমানুপাতিক।

এবারে চল দেখা যাক কেন শূন্যস্থানে একটি ফোটন থেকে পেয়ার প্রোডাকশন সম্ভব নয়। খুব সহজেই ব্যাপারটা বোঝা যায় যদি এটা ধরে নেওয়া হয় যে প্রারম্ভিক ফোটনের শক্তি (h\nu/c) এমন যে তার থেকে উৎপন্ন ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার মৌলকণা জোড়ের গতিশক্তি শূন্য। যেমন ইলেকট্রন-পজিট্রন পেয়ার প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে ফোটনের শক্তি যদি ঠিক 1.02 MeV হয় তবে ভর-শক্তির সংরক্ষণ সূত্র অনুসারে তার ফলে উৎপন্ন কণা জোড়ের প্রতিটির গতিশক্তি শূন্য হবে। ফলস্বরূপ ওই কণা জোড়ের মোট রৈখিক ভরবেগও শূন্য। কিন্তু প্রারম্ভিক ফোটনের ভরবেগের মান ছিল h\nu/c, যা মোটেই শূন্য নয়। অর্থাৎ পেয়ার প্রোডাকশনের আগে ও পরের মোট ভরবেগ ভিন্ন। সোজা কথায় তাহলে ভরবেগের সংরক্ষণ নীতি প্রযোজ্য হলনা। কিন্তু প্রকৃতিতে ভরবেগের সংরক্ষণ নীতি অবহেলা করে কোন কিছু ঘটা সম্ভব নয়। তাই শূন্যস্থানে (যেখানে অপর কোন পদার্থ নেই) একটি ফোটন থেকে পেয়ার প্রোডাকশন সম্ভব নয়। এটা অংকের মাধ্যমেও করে দেখা সম্ভব। মনে কর ফোটনের শক্তি E, এবং কণাদ্বয়ের শক্তি যথাক্রমে E_1E_2। গণনার সুবিধের জন্য ধরে নিচ্ছি যে ফোটনটি ধনাত্মক x অক্ষ বরাবর গতিশীল এবং ওর ভরবেগ p = E/c। যদি উৎপন্ন কণা দুটির ভরবেগ যথাক্রমে p_1 এবং p_2 হয় তবে ভরবেগের সংরক্ষণ নীতি অনুসারে,

\displaystyle p = p_{1x} +p_{2x} …………………….(2)

যেখানে p_{1x} এবং p_{2x} হল কণাদুটির ভরবেগের x উপাদান। বিশেষ আপেক্ষিকতা থেকে,

\displaystyle begin{aligned} E_1^2 &= p_1^2c^2+m^2c^4 \ &= c^2(p_{1x}^2+p_{1y}^2)+m^2c^4\ & > c^2p_{1x}^2 end{aligned}

অতএব,

\displaystyle  E_1 > p_{1x}c ……………………………(3)

একইভাবে,

\displaystyle  E_2 > p_{2x}c ………………………(4)

অতএব (3) ও (4) ব্যবহার করে,

\displaystyle  (E_1+E_2)^2 > (p_{1x}+p_{2x})^2c^2 =p^2c^2 = E^2 implies E_1+E_2 > E

অর্থাৎ ভরবেগের সংরক্ষণ নীতি প্রয়োগ করলে শক্তির সংরক্ষণ নীতি প্রযোজ্য হচ্ছে না। চল এবারে দেখা যাক যদি শক্তির সংরক্ষণ নীতি প্রয়োগ করা যায় তবে কি হয়।

\displaystyle begin{aligned} &E = (E_1+E_2) \ &text{or, } E^2 = E_1^2 + E_2^2 + 2E_1E_2 \  &text{or, } p^2c^2 > p_{1x}^2c^2 +p_{2x}^2c^2 + 2p_{1x}p_{2x}c^2 \ &text{or, } p^2c^2 > (p_{1x}+p_{2x})^2c^2 \ &text{or, } p > p_{1x} + p_{2x} end{aligned}

স্পষ্টতই ভরবেগের সংরক্ষণ নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে। তার মানে শূন্যস্থানে শুধু একটি ফোটন থেকে পেয়ার প্রোডাকশন হলে ভরবেগ ও শক্তির সংরক্ষণ নীতি একসাথে প্রযোজ্য হয় না। সেকারণেই শূন্যস্থানে শুধু একটি ফোটন থেকে পেয়ার প্রোডাকশন সম্ভব নয়।

এবারে দেখা যাক শূন্যস্থানে দুটি ফোটন থেকে পেয়ার প্রোডাকশন সম্ভব কি না! তার জন্য আমরা বিশেষ আপেক্ষিকতার প্রতীকগুচ্ছ ব্যবহার করব। ভর-শক্তি এবং ভরবেগের সংরক্ষণ নীতিকে বিশেষ আপেক্ষিকতায় ভরবেগের ফোর ভেক্টরের সাহায্যে একত্রে বেধে একটি সুচারু রূপ দেওয়া হয়। দেখা যায়, যেকোন সংঘর্ষের ক্ষেত্রে মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর সংরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ সংঘর্ষের আগে ও পরে মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর একই থাকবে। যদি পেয়ার প্রোডাকশনের আগে দুটি ফোটনের মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর {\bf P} এবং পেয়ার প্রোডাকশনের ফলে উৎপন্ন কণাদুটির মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর {\bf Q} হয় তবে,

\displaystyle {\bf P} = {\bf Q} ……………………(5)

সুতরাং ওই দুটি ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্যের বর্গও (square of the length or inner product or norm) একই হবে। [মনে রাখবে মিনকোভস্কি স্থানে ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্য নির্ণয়ের পদ্ধতি কিন্তু সাধারণ ত্রিমাত্রিক ভেক্টরের দৈর্ঘ্য বের করার থেকে একটু ভিন্ন।]

\displaystyle P_{\mu}P^{\mu} = Q_{\nu}Q^{\nu} …………………… (6)

মনে কর ফোটন দুটির শক্তি যথাক্রমে E এবং e\psilon। একটি ফোটন +x অক্ষ বরাবর গতিশীল এবং ওর ভরবেগ p_1 = E/c। এই ফোটনের ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}E/c \ p_1 \ 0 \ 0 end{matrix} \right)  text{with } E = p_1c

অপর ফোটন +x অক্ষের সাথে theta কোণে গতিশীল এবং ওর ভরবেগ p_2 = e\psilon/c। দ্বিতীয় ফোটনটির জন্য ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}e\psilon/c \ p_2costheta \ p_2s\intheta \ 0 end{matrix} \right)  text{with } e\psilon = p_2c

অতএব পেয়ার প্রোডাকশনের পূর্বের মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle {\bf P} = \left(begin{matrix}(e\psilon+E)/c \ p_1+p_2costheta \ p_2s\intheta \ 0 end{matrix} \right)

পেয়ার প্রোডাকশনের পূর্বের ভরবেগের ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্যের বর্গ,

\displaystyle begin{aligned} P_{\mu}P^{\mu} &= \frac{1}{c^2}(e\psilon+E)^2 - (p_1+p_2costheta)^2 - p_2^2sin^2theta \ & = \frac{1}{c^2}\left[ e\psilon^2 + E^2 +2e\psilon E -p_1^2c^2-p_2^2c^2cos^2theta-2c^2p_1p_2costheta - p_2^2sin^2theta\right] \ & = \frac{1}{c^2}\left[ e\psilon^2 + E^2 +2e\psilon E -E^2-e\psilon^2(cos^2theta+sin^2theta)-2Ee\psiloncostheta\right] \ & = \frac{2e\psilon E}{c^2}(1-costheta) end{aligned} ………………. (7)

এবারে আমরা পেয়ার প্রোডাকশনের পরে ভরবেগের ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করব। এই কাজটি অপেক্ষাকৃত সহজে করার জন্য আমরা একটু বিশেষ উপায় প্রয়োগ করব। তোমরা নিশ্চয় ভরকেন্দ্রের কথা শুনেছ। এটাও হয়তো জানো যে একাধিক কণার সংঘর্ষ সহজে গণনা করার জন্য ভরকেন্দ্রের সাথে সমবেগে গতিশীল রেফারেন্স ফ্রেম ব্যবহার করা হয়। এই ফ্রেমের মস্ত সুবিধা হল যে সংঘর্ষের আগে কিংবা পরে মোট (ত্রিমাত্রিক) ভরবেগ শূন্য হয়। একটি উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করে বলছি। মনে কর দুটি কণার সংঘর্ষ হচ্ছে। তাহলে ভরকেন্দ্রের সাথে সমবেগে গতিশীল ফ্রেমে দেখা যায় যে সংঘর্ষের পূর্বে ওই দুটি কণার মোট ভরবেগ শূন্য। একইভাবে সংঘর্ষের পরও দেখা যাবে ওই ফ্রেমে কণা দুটির মোট ভরবেগ শূন্য। পেয়ার প্রোডাকশনের পরে যদি আমরা আমাদের ফ্রেম থেকে লোরেন্‍ৎস রূপান্তরণের মাধ্যমে ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার মৌলকণার ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে পৌঁছে যাই তবে সেই ফ্রেমে ওই কণাদুটির মোট ত্রিমাত্রিক ভরবেগ শূন্য। তার মানে ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে ওই দুটি কণার ত্রিমাত্রিক ভরবেগের মান সমান কিন্তু তাদের অভিমুখ পরষ্পরের বিপরীত। যদি কণাদুটির প্রত্যেকের ভর m হয় এবং ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে ওদের ভরবেগের মান p_e হয় তবে স্পষ্টতই ওই ফ্রেমে কণাদুটির মোট শক্তি 2E_e=2sqrt{p_e^2c^2+m^2c^4}। অতএব ভরকেন্দ্রের সাথে সমবেগে গতিশীল ফ্রেমে কণাদুটির ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle {\bf Q}_{CM} = \left(begin{matrix}2E_e/c \0 \0 \0 end{matrix} \right)

তোমরা দেখেছো যে যেকোন ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্য হল স্কেলার রাশি, যা লোরেন্‍ৎস রূপান্তরণের ফলে অপরিবর্তিত থাকে। অতএব ভরকেন্দ্রের সাথে সমবেগে গতিশীল ফ্রেম এবং আমাদের সাধারণ ল্যাবরেটরি ফ্রেম, দুটোতেই ভরবেগের ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্য একই থাকবে। তাই আমরা লিখতে পারি যে পেয়ার প্রোডাকশনের পরে ভরবেগের ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্যের বর্গ,

\displaystyle Q_{\nu}Q^{\nu} = \frac{4E_e^2}{c^2} …………………… (8)

সুতরাং, ভরবেগের ফোর ভেক্টরের সংরক্ষণ নীতি এবং (6), (7) ও (8) একত্রে ব্যবহার করে,

\displaystyle \frac{2e\psilon E}{c^2}(1-costheta) = \frac{4E_e^2}{c^2}

যদি আমরা পেয়ার প্রোডাকশনের জন্য ফোটনদুটির ন্যুনতম শক্তি নির্ণয় করতে চাই তবে ধরে নেব যে ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার কণাদুটির ভরবেগের মান শূন্য (p_e = 0)। অতএব,

বা, \displaystyle mc^2 =sqrt{e\psilon E(1-costheta)/2} …………. (9)

এই সমীকরণ থেকে e\psilonE শক্তিসম্পন্ন দুটি ফোটনের পরষ্পরের মিথোষ্ক্রিয়ার ফলে পেয়ার প্রোডাকশনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যুনতম শক্তির মান নির্ণয় করা যায়। স্পষ্টতই যদি theta=0 হয় তবে পেয়ার প্রোডাকশন সম্ভব নয়।

এবারে একটি ইলেকট্রন ও একটি ফোটনের মিথোষ্ক্রিয়ার ফলে ইলেকট্রন-পজিট্রন পেয়ার প্রোডাকশন নিয়ে আলোচনা করা যাক। যথারীতি ধরে নেব ফোটনটি x অক্ষ বরাবর গতিশীল এবং ওর ভরবেগ ও শক্তি যথাক্রমে p এবং E= pc। তবে ওর ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}E/c \ p \ 0 \ 0 end{matrix} \right)  text{with } E = pc

আরও মনে কর ফোটনের সঙ্গ মিথোষ্ক্রিয়ার পূর্বে ইলেকট্রনটির ভরবেগ শূন্য। যদি ইলেকট্রনের ভর m হয়, তবে ওর ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}mc^2/c \ 0 \ 0 \ 0 end{matrix} \right)

অতএব, মিথোষ্ক্রিয়া বা \interaction -এর পূর্বে মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle {\bf P} = \left(begin{matrix}(E+mc^2)/c \ p \ 0 \ 0 end{matrix} \right)

এই ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্যের বর্গ,

\displaystyle begin{aligned} P_{\mu}P^{\mu} & = \frac{1}{c^2}(E+mc^2)^2 -p^2 \ & = \frac{1}{c^2} \left[ E^2 +m^2c^4 +2Emc^2 - p^2c^2\right] \ & = m^2c^2 + 2mE end{aligned} ………………………….(10)

মিথোষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে পেয়ার প্রোডাকশনের পরে মোট তিনটি কণা থাকবে, উৎপন্ন ইলেকট্রন-পজিট্রন পেয়ার এবং আগে থেকেই অবস্থিত একটি ইলেকট্রন। ওই তিনটি কণার ভরকেন্দ্রের সাথে সমবেগে গতিশীল ফ্রেমে তিনটি কণার মোট ভরবেগ শূন্য। তার মানে ওই ফ্রেমে তিনটি কণার ভরবেগের মান সমান এবং ওদের অভিমুখ পরষ্পরের সাথে 120 ডিগ্রী কোণে অবস্থিত। যদি ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে কণা তিনটির প্রত্যেকের ভরবেগের মান p_e হয় তবে, স্পষ্টতই কণা তিনটির মোট শক্তি 3E_e=3sqrt{p_e^2c^2+m^2c^4}। অর্থাৎ ভরকেন্দ্রের সাথে সমবেগে গতিশীল ফ্রেমে ওই তিনটি কণার মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}3E_e/c \ 0 \ 0 \ 0 end{matrix} \right)

এর দৈর্ঘ্যের বর্গ,

\displaystyle Q_{\nu}Q^{\nu} = \frac{9E_e^2}{c^2} ……………….. (11)

যেহেতু আমরা একটি ফোটনের সাথে একটি ইলেকট্রনের মিথোষ্ক্রিয়ার ফলে ইলেকট্রন-পজিট্রন পেয়ার প্রোডাকশনের জন্য ফোটনের ন্যুনতম শক্তি নির্ণয় করতে চাই, তাই আমরা ধরে নেব যে পেয়ার প্রোডাকশনের পরে ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে প্রতিটি কণার ভরবেগ শূন্য (p_e = 0)। সুতরাং, E_e = mc^2 এবং ভরবেগের ফোর ভেক্টরের সংরক্ষণ নীতি (6 নং সমীকরণ) অনুসারে,

\displaystyle m^2c^2 + 2mE = 9m^2c^2 implies E = 4mc^2 …………….. (12)

অর্থাৎ একটি ফোটনের সাথে একটি স্থির ইলেকট্রনের সংঘর্ষের ফলে ইলেকট্রন-পজিট্রন পেয়ার প্রোডাকশন হতে গেলে ফোটনের প্রয়োজনীয় ন্যুনতম শক্তির পরিমাণ 4mc^2, যেখানে m হল ইলেকট্রনের ভর।

সবশেষে আমরা M ভরের কোন নিউক্লিয়াসের সাথে একটি ফোটনের মিথোষ্ক্রিয়ার ফলে পেয়ার প্রোডাকশন নিয়ে বলছি। যথারীতি আগের মতই ফোটনের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}E/c \ p \ 0 \ 0 end{matrix} \right)  text{with } E = pc

যদি নিউক্লিয়াসটি প্রথমে স্থির থাকে, তবে ওর ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}Mc^2/c \ 0 \ 0 \ 0 end{matrix} \right)

অতএব, পেয়ার প্রোডকশনের পূর্বের মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle {\bf P} = \left(begin{matrix}(E+Mc^2)/c \ p \ 0 \ 0 end{matrix} \right)

এই ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্যের বর্গ,

\displaystyle begin{aligned} P_{\mu}P^{\mu} & = \frac{1}{c^2}(E+Mc^2)^2 -p^2 \ & = \frac{1}{c^2} \left[ E^2 +M^2c^4 +2EMc^2 - p^2c^2\right] \ & = M^2c^2 + 2ME end{aligned} ……………………….(13)

পেয়ার প্রোডাকশনের পর মোট কণার সংখ্যা তিনটি – নিউক্লিয়াস এবং উৎপন্ন ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার কণা। ওই তিনটি কণার ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে ওদের মোট ত্রিমাত্রিক ভরবেগ শূন্য। যেহেতু আগের মতই আমরা পেয়ার প্রোডাকশনের জন্য প্রয়োজনীয় ফোটনের ন্যুনতম শক্তি নির্ণয় করতে চাই, তাই আমরা ধরে নেবে যে ভরকেন্দ্রের ফ্রেমে প্রতিটি কণার ত্রিমাত্রিক ভরবেগ শূন্য। যদি ম্যাটার বা অ্যান্টিম্যাটার মৌলকণার ভর m হয়ে তবে পেয়ার প্রোডাকশনের পরে ভরকেন্দ্রের সাথে সমবেগে গতিশীল ফ্রেমে মোট ভরবেগের ফোর ভেক্টর,

\displaystyle \left(begin{matrix}(2mc^2+Mc^2)/c \ 0 \ 0 \ 0 end{matrix} \right)

মিনকোভস্কি স্থানে এই ভেক্টরের দৈর্ঘ্যের বর্গ (inner product),

\displaystyle  Q_{\nu}Q^{\nu} = 4m^2c^2+M^2c^2 + 4Mmc^2 ……………… (14)

ভরবেগের ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্য অপরিবর্তিত থাকে বলে,

\displaystyle M^2c^2 + 2ME = 4m^2c^2+M^2c^2 + 4Mmc^2 implies E = \frac{2m^2c^2}{M} + 2mc^2 ……………………….. (16)

এই সমীকরণ ব্যবহার করে পেয়ার প্রোডাকশনের জন্য প্রয়োজনীয় ফোটনের ন্যুনত্ম শক্তির মান গণনা করা সম্ভব। যেহেতু সাধারণভাবে M>>m, প্রথম পদটি প্রায় শূন্য। সুতরাং,

E = 2mc^2 …………………………(16)

এই ক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের ভর উৎপন্ন ম্যাটার বা অ্যান্টিম্যাটার মৌলকণার ভরের থেকে অনেক বেশি হওয়ার ওর গতিশক্তি প্রায় শূন্য হয়। তাই ফোটনের মোট শক্তি শুধু ম্যাটার বা অ্যান্টিম্যাটার কণা সৃষ্টিতেই ব্যবহৃত হয়। নিউক্লিয়াসটি ফোটনের ভরবেগ গ্রহণ করে শুধু ভরবেগের সংরক্ষণ নীতি মেনে চলতে সহায়তা করে।


ফোর ভেক্টরের দৈর্ঘ্য

কোন ফোর ভেক্টর

\displaystyle {\bf P} = \left( begin{matrix} p^0 \ p^1 \ p^2 \ p^3 end{matrix} \right)

মিনকোভস্কি স্থানে ওর দৈর্ঘ্যের বর্গ,

\displaystyle P_{\mu}P^{\mu}=eta_{\mu \nu}P^{\nu}p^{\mu} = (p^0)^2 -(p^1)^2 -(p^2)^2-(p^3)^2

যেখানে eta_{\mu \nu} হল মিনকোভস্কি স্থানে মেট্রিক টেন্সর।

References
1. W. E. Burcham and M. Jobes, Nuclear and Particle Physics
2. Wikipedia তে পেয়ার প্রোডাকশন
3. S. N. Ghoshal, Nuclear Physics

Leave a Reply

Your email address will not be published.