কির্শফের সূত্র

কির্শফের সূত্র হল তড়িৎ বর্তনীতে কারেন্ট ও ভোল্টেজ পার্থক্য সংক্রান্ত দুটি সমীকরণ যা ব্যবহার করে বর্তনীর যেকোন অংশের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের মান নির্ণয় করা যায়। ১৮৪৫ সালে জার্মান পদার্থবিদ গুস্তাফ কির্শফ ওই সূত্রদুটি আবিষ্কার করেন। কির্শফের সূত্র সাধারণত ডি.সি. এবং স্বল্প কম্পাঙ্কের এ.সি. বর্তনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত কাজকর্মে এর বহুল ব্যবহার প্রচলিত। কির্শফের দুটি সমীকরণের একটি কারেন্ট সংক্রান্ত এবং দ্বিতীয়টি বিভব পার্থক্য সংক্রান্ত।

কির্শফের কারেন্ট সংক্রান্ত সূত্র

kirchoff's-current-law-bengali- কির্শফের সূত্র
চিত্র ১ – বর্তনীর নোডে দুটি কারেন্ট প্রবেশ করছে (I_1, I_3) এবং দুটি বহির্গত হচ্ছে (I_2, I_4)

বর্তনীর কোন বিন্দুতে একাধিক পরিবাহী যুক্ত হলে তাকে বলা হয় নোড বা জংশন। কির্শফের কারেন্ট সূত্র অনুসারে এইরকম কোন নোডে মোট যে পরিমাণ কারেন্ট প্রবেশ করে ঠিক সেই পরিমাণ কারেন্ট বেরিয়েও যায়। যেহেতু বর্তনীতে কারেন্টের অভিমুখ বোঝানোর জন্য ধনাত্মক বা ঋণাত্মক চিহ্ন ব্যবহার করা হয় তাই অংকের ভাষায় কোন নোডে বিভিন্ন পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহীত কারেন্টের বীজগাণিতিক যোগফলের মান শূন্য। অর্থাৎ,

\displaystyle \sum_{i=1}^n I_i = 0 ………………. (1)

যেখানে I_i হল i তম পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে ওই নোডে প্রবাহীত কারেন্ট (উপযুক্ত ধনাত্মক বা ঋণাত্মক চিহ্ন সহ) এবং n হল ওই নোডে যুক্ত মোট পরিবাহীর সংখ্যা। একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হতে পারে। ১ নম্বর ছবিতে একটি নোড দেখানো হয়েছে যেখানে চারটি পরিবাহী একসাথে যুক্ত। যদি ওদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহীত তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ ছবিতে যেমন দেখানো হয়েছে তেমন হয় তবে,

\displaystyle I_1 + I_3 = I_2+I_4 implies I_1+I_3 -I_2 -I_4 = 0 …………….. (2)

কির্শফের কারেন্ট সূত্র মূলত আধান সংরক্ষণের একটি ফলাফল মাত্র। যেহেতু আধান সৃষ্টি বা বিনাশ করা যায়না, তাই কোন নোডে বিভিন্ন পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে যে পরিমাণ আধান প্রতি একক সময়ে প্রবেশ করবে ঠিক সেই পরিমাণ আধান প্রতি একক সময়ে বেরিয়েও যাবে। মনে রাখবে যে আধান প্রবাহের হারই হল তড়িৎ প্রবাহ বা কারেন্ট। কির্শফের কারেন্ট সূত্রকে অনেক সময় কির্শফের প্রথম সূত্রও বলা হয়।

কির্শফের ভোল্টেজ সূত্র

তোমরা হয়তো জানো যে স্থির তড়িৎ ক্ষেত্র একটি কনজার্ভেটিভ ফিল্ড। অর্থাৎ তড়িৎ ক্ষেত্রে একটি আধানকে কোন এক বিন্দু থেকে শুরু করে একটি আবদ্ধ পথে ঘুরিয়ে যদি পুনরায় শুরুর বিন্দুতে ফিরিয়ে আনা যায় তবে মোট কাজের পরিমাণ শূন্য। একইভাবে একটি আধানকে কোন আবদ্ধ বর্তনীর কোন এক বিন্দু থেকে শুরু করে পুরো বর্তনী ঘুরিয়ে যদি আবার যাত্রা শুরুর বিন্দুতে নিয়ে আসা যায় তবে মোট কাজের পরিমাণও হবে শূন্য। তার মানে পুরো আবদ্ধ বর্তনী ঘুরতে ওই আধানকে যতগুলি বর্তনীর উপাদানের (যেমন রোধক, ধারক, আবেশক, ব্যাটারী ইত্যাদি) মধ্যে দিয়ে যেতে হবে তাদের প্রতিটির দুপ্রান্তের মাঝের বিভব পার্থক্যের বীজগাণিতিক যোগফলের মান শূন্য। অর্থাৎ কোন আবদ্ধ বর্তনীর বিভিন্ন উপাদানের প্রতিটির দুপ্রান্তের বিভব পার্থক্যসমূহের বীজগাণিতিক যোগফলের মান শূন্য। ইহাই কির্শফের ভোল্টেজ সূত্র। অংকের ভাষায়,

\displaystyle \sum_{i=1}^n V_i = 0

যেখানে V_i হল বর্তনীর i তম উপাদানের দুপ্রান্তের বিভব পার্থক্য (উপযুক্ত ধনাত্মক বা ঋণাত্মক চিহ্ন সহ) এবং n হল ওই আবদ্ধ বর্তনীতে যুক্ত মোট উপাদানের সংখ্যা। এই সূত্র প্রয়োগ করতে হলে বর্তনীর বিভিন্ন উপাদানের দুপ্রান্তের মাঝে বিভব পার্থক্যের চিহ্ন সম্মন্ধে ভাল করে খেয়াল রাখতে হবে। ওই আবদ্ধ বর্তনীর যেকোন বিন্দু থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট অভিমুখে (clockwise বা anticlockwise) অগ্রসর হলে কোনো উপাদানের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করার সময় যদি বেশি বিভব থেকে কম বিভবের দিকে যাওয়া হয় তবে সেই উপাদানের দুপ্রান্তের মাঝের ভোল্টেজ ঋণাত্মক ধরা হয়। অন্যথায় বিভব পার্থক্য ধনাত্মক। [মনে রাখবে রোধকের মধ্যে তড়িৎ প্রবাহ সর্বদা বেশি থেকে কম বিভবের দিকে হয়। অর্থাৎ কারেন্টের অভিমুখে অগ্রসর হলে রোধকের দুইপ্রান্তের বিভব পার্থক্য ঋণাত্মক। কারেন্টের বিপরীতে অগ্রসর হলে রোধকের দুপ্রান্তের বিভব পার্থক্য ধনাত্মক। অপরপক্ষে ব্যাটারীর ক্ষেত্রে অগ্রসরের অভিমুখ যদি ব্যাটারীর ঋণাত্মক থেকে ধনাত্মক তড়িৎদ্বারের দিকে হয় তবে ব্যাটারীর বিভব পার্থক্য হবে ধনাত্মক, কিন্তু যদি অভিমুখ ব্যাটারীর ধনাত্মক থেকে ঋণাত্মক তড়িৎদ্বারের দিকে হয় তবে সেক্ষেত্রে ব্যাটারীর বিভব পার্থক্য হয় ঋণাত্মক।]

কির্শফের সূত্র
চিত্র ২ – তিনটি রোধক ও একটি ব্যাটারী সম্বলিত আবদ্ধ বর্তনী। প্রতিটি উপাদানের দুপ্রান্তের বিভব পার্থক্যের বীজগাণিতিক যোগফল শূন্য।

একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হতে পারে। ২ নম্বর ছবিতে একটি আবদ্ধ বর্তনী দেখানো হয়েছে যেখানে চারটি উপাদান রয়েছে – একটি ব্যাটারী ও তিনটি রোধক। যদি ওদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহীত তড়িৎ প্রবাহের (i) অভিমুখ ছবিতে যেমন দেখানো হয়েছে তেমন হয় তবে,

\displaystyle V_{CC} - iR_1  - iR_2  - iR_3  = 0 ………….. (3)

লক্ষ্য কর যে তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখে রোধকগুলির মধ্যে দিয়ে যাবার সময় বেশি বিভব থেকে কম বিভবের দিকে যাওয়া হচ্ছে, তাই তাদের দুপ্রান্তের মাঝের বিভব পার্থক্য ঋণাত্মক। অপরপক্ষে তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখে ব্যাটারির মধ্যে দিয়ে যাবার সময় কম থেকে বেশি বিভবের দিকে যাওয়া হচ্ছে তাই ওর দুপ্রান্তের বিভব পার্থক্য ধনাত্মক।

কির্শফের সূত্র – একটি উদাহরণ

কির্শফের সূত্র
চিত্র ৩ – কির্শফের সূত্র প্রয়োগের একটি উদাহরণ।

৩ নম্বর রেখাচিত্রে প্রদর্শিত দুটি ব্যাটারী ও তিনটি রোধক সম্বলিত বর্তনীটি লক্ষ্য কর। বিভিন্ন উপাদানের রোধ ও ব্যাটারীর ভোল্টেজ ছবিটিতেই দেওয়া রয়েছে। কির্শফের সূত্র প্রয়োগ করতে গেলে প্রথমে আমাদের কারেন্ট বা তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ প্রয়োজন। যেহেতু আমরা জানিনা তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ ঠিক কি হবে তাই আমরা ধরে নিয়েছি যে ছবিতে যেমন দেখানো হয়েছে তেমনভাবে তড়িৎ প্রবাহীত হচ্ছে (I_1, I_2, I_3)। [এখানে উল্লেখ্য যে তুমি তড়িৎ প্রবাহের ভিন্নরকম অভিমুখও ধরে নিতে পারতে। গণনা শেষে যদি দেখ যে বিভিন্ন তড়িৎ প্রবাহের মান ধনাত্মক তবে তুমি যে অভিমুখ ধরে নিয়েছিলে সেটা ঠিক। কিন্তু যদি দেখ যে কারেন্টের মান ঋণাত্মক তবে প্রবাহের অভিমুখ তুমি যা ধরেছিলে তার উল্টো।]

ডানদিকের নোডে কির্শফের কারেন্ট সূত্র প্রয়োগ করে,

I_1 = I_2 +I_3 ……………………(4)

উপরের আবদ্ধ বর্তনীতে কির্শফের ভোল্টেজ সূত্র প্রয়োগ করে [চক্রাকার তীরচিহ্নের অভিমুখে অগ্রসর হয়ে],

-I_1R_1 - I_2R_2 +E_1 = 0 …………… (5)

নিচের আবদ্ধ বর্তনীতে কির্শফের ভোল্টেজ সূত্র প্রয়োগ করে [চক্রাকার তীরচিহ্নের অভিমুখে অগ্রসর হয়ে],

-E_2-I_3R_3  -E_1 +I_2R_2 = 0 …………… (6)

যেহেতু I_2 এর অভিমুখ এই বর্তনীর চক্রাকার তীরচিহ্নের বিপরীত তাই এই তীরচিহ্নের অভিমুখে R_2 অতিক্রম করার সময় কম থেকে বেশি ভোল্টেজের দিকে যেতে হয়। সেকারণেই R_2 রোধের দুপ্রান্তের মাঝের বিভব পার্থক্য ধনাত্মক নেওয়া হয়েছে। এবারে উপরোক্ত তিনটি সমীকরণের সমাধান করে সহজেই তিনটি অজানা রাশি I_1, I_2, I_3 -এর মান বের করা সম্ভব।

References
1. Wikipedia -তে কির্শফের সূত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published.