কোয়ান্টাম মেকানিক্স – ৪ – তরঙ্গ-কণা দ্বৈত সত্তা

এর আগে আমরা দেখেছি যে বোরের তত্ত্ব ইলেকট্রনের ষ্টেশনারী অরবিটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোয়ান্টাইজেশন নীতির উৎপত্তি সম্পর্কে কোন ব্যাখ্যা দেয়না। এই সমস্যার উত্তর খুজতে গিয়ে ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসী বিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রোয়ি (de Broglie, লুই ডি ব্রগলী) সম্পূর্ণ মৌলিক একটি প্রস্তাব করেন। দ্য ব্রোয়ির এই প্রস্তাবটি আলোচনা করার আগে আমরা অন্য আরেকটি বিষয়ে একটু চোখ বুলিয়ে নেব। ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চুম্বকীয় তত্ত্ব ও থমাস ইয়ংয়ের ডাবল স্লিট পরীক্ষার মাধ্যমে উণবিংশ শতাব্দিতে এটা প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে আলো এক প্রকার তরঙ্গ। বিংশ শতাব্দির শুরুতে আইনস্টাইন (ফোটো-ইলেক্ট্রিক এফেক্ট) ও ম্যাক্স প্লাঙ্কের (ব্ল্যাকবডি বিকিরণ) কাজ থেকে এটা বোঝা যায় যে আলোর কণা ধর্মও আছে। অর্থাৎ আলো তরঙ্গ ও কণা দুই রকম ভাবেই আচরণ করে।  আলোর এই দ্বৈত বৈশিষ্ট থেকেই দ্য ব্রোয়ি বোরের কোয়ান্টাইজেশন নীতির উৎপত্তি সম্পর্কিত ধাঁধার উত্তর খুজে পান।

লুই দ্য ব্রোয়ি প্রথমে ইতিহাস নিয়ে পড়েছিলেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উনি আর্মীতেও চাকরী করেন। ১৯২৪ সালে মাত্র তিন পাতার পি.এইচ. ডি. থিসীসে (Ph.D. thesis) তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন যে আলোর যেমন তরঙ্গ ও কণা ধর্ম দুটোই আছে, তেমনি যে কোন গতিশীল বস্তুরও (যেমন ইলেক্ট্রন) কণা ও তরঙ্গ দুই সত্ত্বাই আছে। এটাই তরঙ্গ-কণা দ্বৈতবাদ। পদার্থের এই তরঙ্গের নাম দেওয়া হয় ম্যাটার ওয়েভ (matter wave)। এই প্রস্তাবটি এতটাই মৌলিক ছিল যে প্রথমে যাদের কাছে দ্য ব্রোয়ির থিসীস পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল তারা কেউই ব্যাপারটি বুঝতে না পেরে থিসীসটিকে আইনস্টাইনের কাছে পাঠিয়ে দেন। বলাই বাহুল্য আইনস্টাইন আনন্দের সঙ্গে  দ্য ব্রোয়ির প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে লুই দ্য ব্রোয়ি পদার্থবিদ্যায় সম্পূর্ণ নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেন, যা ওয়েভ মেকানিক্স নামে খ্যাত হয়। সেই সমস্ত গতিশীল বস্তুকণা যাদের উল্লেখযোগ্য তরঙ্গ ধর্ম আছে তাদের গতি পর্যালোচনা করার জন্য এই ওয়েভ মেকানিক্সই একমাত্র উপায়; নিউটনের সূত্র ও ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই ওয়েভ মেকানিক্সই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উৎস। সুতরাং পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রনের গতি পর্যালোচনা করার জন্য যদি ক্লাসিক্যাল তড়িৎ- চুম্বকীয় তত্ত্ব ব্যবহার  করা হয় তবে তার ফল ভূল হতে বাধ্য; বাস্তবে হয়েওছিল তাই। গণনা করার সময় ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্মের কথা আমদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যেহেতু পদার্থের তরঙ্গ ধর্মের উপর ভিত্তি  করেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স গড়ে উঠেছে, তাই পরমাণুর গঠন একমাত্র কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

চল এবার দেখা যাক কিভাবে দ্য ব্রোয়ের এই তরঙ্গ-কণা দ্বৈতবাদ থেকে বোরের কোয়ান্টাইজেশন নীতি ব্যাখ্যা করা যায়। প্লাঙ্কের তত্ত্ব থেকে জানা যায় যে আলোর কণা ফোটনের শক্তি E = h\nu। আর আইনস্টাইন প্রমাণ করেছিলেন যে আলোর ক্ষেত্রে E = pc, যেখানে \nuc হল যথাক্রমে আলোর কম্পাঙ্ক ও বেগ। p হল ফোটনের রৈখিক ভরবেগ (linear momentum)। এই দুটো সমীকরণকে একসাথে করলে আমরা পাই p=h\nu/c। আমরা আরো জানি যে যদি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য lambda হয়, তবে c=\nulambda। সুতরাং, lambda = h/p। দ্য ব্রোয়ি ধরে নিয়েছিলেন যে বস্তুর তরঙ্গের (matter wave) ক্ষেত্রেও তরঙ্গদৈর্ঘ সম্পর্কিত এই সমীকরণটি প্রযোজ্য।

এখন r ব্যাসার্ধের কোন ষ্টেশনারী অরবিটের পরিধি 2pi r। ইলেকট্রনের তরঙ্গ এই অরবিটেই অবস্থান করবে। যেহেতু এই তরঙ্গকে অবশ্যই কন্টিনিউয়াস এবং ডিফারেনশিয়েবেল বা মসৃণ হতে হবে, তাই ষ্টেশনারী অরবিটের পরিধিকে ইলেকট্রনের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের* পূর্ণসংখ্যার গুণিতক (\integer \multiple) হতে হবে। নিচে প্রদত্ত ছবিটি দেখলে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে পারবে। যদি ইলেকট্রনের পরিধি ওর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পূর্ণসংখ্যার গুণিতক না হয় তবে কক্ষপথের কোথাও না কোথাও অবশ্যই ওর তরঙ্গের শুরু ও শেষের মাথা একই দশায় মিলবে না, অর্থাৎ সেখানে তরঙ্গের ফাংশন অবস্থানের সাপেক্ষে মসৃণ এবং নিরবচ্ছিন্ন হবেনা। অতএব, আমরা লিখতে পারি 2pi r = nlambda = nh/p। এখানে n = ১, ২, ৩, ৪,….ইত্যাদি একটি ধণাত্মক পূর্ণসংখ্যা; আর lambdap হচ্ছে যথাক্রমে ইলেকট্রনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও রৈখিক ভরবেগ। যদি কক্ষপথে  ইলেকট্রনের বেগ v হয়, তবে p = mv, যেখানে m হল ইলেকট্রনের ভর। এই দুটি সমীকরণ একটু সাজিয়ে লিখলেই দেখতে পাবে যে mvr = nh/2pi। আশা করি তোমাদের মনে আছে যে এটাই বোরের কোয়ান্টাইজেশন নীতি। এই সহজ অথচ অসামান্য আবিষ্কারের জন্য লুই দ্য ব্রোয়িকে ১৯২৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়।

কন্টিনিউয়াস (বাদিকে) ও ডিস-কন্টিনিউয়াস (ডানদিকে) তরঙ্গ
Figure1: ইলেকট্রনের কক্ষপথে (বৃত্তাকার) কন্টিনিউয়াস (বাদিকে) ও ডিসকন্টিনিউয়াস ও অমসৃণ (ডানদিকে) তরঙ্গ

এবারে তোমাদের একটি প্রশ্ন করব। ধর, হেডস্যার রামবাবু সাইকেল চালিয়ে স্কুল থেকে ফিরছেন। তাহলে রামবাবুর বাড়ি ফিরতে কত সময় লাগবে তা নির্ণয় করতে কি তোমরা ওয়েভ মেকানিক্স ব্যবহার করবে? উত্তর হচ্ছে না, ওয়েভ মেকানিক্সের কোনো প্রয়োজন নেই। হেভীওয়েট রামবাবুর ভর খুব বেশী হওয়ার জন্য ওনার রৈখিক ভরবেগ (p = mv) খুব বেশী। তাই ওনার তরঙ্গদৈর্ঘ ওনার আকারের তুলনায় অত্যন্ত কম। সেই কারণে রামবাবুর ক্ষেত্রে নিউটনের সূত্র প্রয়োগ করেই যথেষ্ট পরিমানে সঠিক ফলাফল গণনা করা সম্ভব। অবশ্য যদি রামবাবু বটতলায় দাঁড়িয়ে ভাট বকতে শুরু করেন তাহলে নিউটন তো কোন ছার, স্বয়ং ভগবানেরও সাধ্যি নেই এটা বলার যে উনি কখন বাড়ি পৌঁছবেন। 😉 ওই ক্ষমতা শুধুমাত্র রামবাবুর গিন্নীর আছে! যাই হোক, আজ এ পর্যন্তই রইল, এর পরের পোষ্টে আমরা দেখব কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আরেকটি অসাধারণ মৌলিক আবিষ্কার। তদবধি ভালো থেকো ও পড়তে থাকো। আর হ্যাঁ, মন্তব্য করতে ভুলোনা যেন।

Footnote:

তরঙ্গদৈর্ঘ্যঃ কোন তরঙ্গের পরপর দুটি একই দশা (phase) যুক্ত বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্বকে ওই তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য (wavelength) বলা হয়। নিচের ছবিটিতে A1 ও A2 দুটি পরপর একই দশা যুক্ত বিন্দু এবং A1 ও A2 -র মধ্যের দূরত্বই ওই তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য (lambda)। একইভাবে B1ও B2 এবং C1ও C2 -র মধ্যের দূরত্বও ওই তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

Figure 2: তরঙ্গের দুটি পরপর একই দশা যুক্ত বিন্দুর (যেমন A1 ও A2, B1ও B2 এবং C1ও C2) মধ্যের দূরত্বই তরঙ্গদৈর্ঘ্য (lambda)।

যদি ইলেকট্রনের অরবিটের পরিধি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পূর্ণসংখ্যার গুণিতক না হয় তাহলে তরঙ্গের শুরুর ও শেষের মাথা পরস্পরের সাথে একই দশায় জুড়বে না (Figure 1); অর্থাৎ তরঙ্গ ডিসকন্টিনিউয়াস এবং অমসৃণ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.