এই পোস্টটি আমাদের একজন পাঠক বন্ধুর অনুরোধে লেখা। ও p-n-p ট্রানজিস্টারের কার্যপ্রনালী জানতে চেয়েছিল। আমরা সেটাই আজ সংক্ষেপে আলোচনা করব। আশা করি পোস্টটি আরও অনেকর উপকারে লাগবে। p-n-p ট্রানজিস্টারের সরলীকৃত একটি রেখাচিত্র ১ নং ছবিতে দেখানো হয়েছে।

p-n-p ট্রানজিস্টরকে দুটি p-n জংশন ডায়োডের সমন্বয় হিসেবে ধরা যেতে পারে যাদের n অঞ্চলদুটিকে পরষ্পরের সাথে জোড়া হয়েছে। এখানে মনে করিয়ে দেব যে, n-টাইপ সেমিকন্ডাকটরে তড়িৎ পরিবহন সংঘটিত হয় প্রধাণত ঋণাত্মক ইলেকট্রনের মাধ্যমে এবং p-টাইপ সেমিকন্ডাকটরে তড়িৎ প্রবাহ হয় মূখ্যত ধনাত্মক হোলের (holes) মাধ্যমে। n অঞ্চলে অবশ্যি কিছু মাত্রায় হোলও থাকে, যাদের সংখ্যা ইলেকট্রনেদের তুলনায় প্রায় নগন্য এবং p অঞ্চলেও কিছু মাত্রায় ইলেকট্রন থাকে যাদের সংখ্যা হোলেদের তুলনায় খুবই সামান্য। তাই n অঞ্চলের হোল ও p অঞ্চলের ইলেকট্রনকে মাইনোরিটি (সংখ্যালঘু) পরিবাহক (minority carrier) বলা হয়। অপরপক্ষে n অঞ্চলের ইলেকট্রন ও p অঞ্চলের হোলকে বলা হয় মেজরিটি (সংখ্যাগুরু) পরিবাহক (minority carrier)। ডায়োডের p ও n প্রান্তের সাথে যদি যথাক্রমে ব্যাটারির ধনাত্মক ও ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার যুক্ত করা হয় তবে বলা হয় যে ডায়োডটিকে সম্মুখী বায়াস বা ফরওয়ার্ড বায়াস করা হয়েছে। আর যদি p ও n প্রান্তের সাথে যথাক্রমে ব্যাটারির ঋণাত্মক ও ধনাত্মক তড়িৎদ্বার যুক্ত করা হয় তবে বলা হয় যে ডায়োডটিকে বিমুখী বায়াস বা রিভার্স বায়াস করা হয়েছে। ফরওয়ার্ড বায়াস করা অবস্থায় ডায়োডের মধ্যে দিয়ে বেশি তড়িৎ প্রবাহ হতে পারে (মেজরিটি পরিবাহকের মাধ্যমে) এবং রিভার্স বায়াস অবস্থায় ডায়োডের মধ্যে দিয়ে খুবই সামান্য কারেন্ট প্রবাহিত হয় মাইনোরিটি পরিবাহকের মাধ্যমে। এই সামান্য পটভূমিকার পরে এবারে আমরা p-n-p ট্রানজিস্টার কিভাবে কাজ করে সেটা দেখব।
p-n-p ট্রানজিস্টরের দুটি p অঞ্চলের মধ্যে একটিতে অপরটির তুলনায় হোলের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে, যাকে বলা হয় এমিটর। এমিটর নামটি থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এটা থেকে হোল নিসৃত হয়। ১ নম্বর ছবিতে এমিটরকে p+ চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়েছে। এর মানে হল খুব বেশি করে হোল ডোপ করা p-টাইপ সেমিকন্ডাকটর। তুলনামুলকভাবে কম পরিমানে হোলের ঘনত্ব যুক্ত অপর p-টাইপ অঞ্চলটিকে বলা হয় কালেক্টর বা সংগ্রাহক। আর মধ্যিখানের n-টাইপ অঞ্চলের নাম হল বেস। সাধারণত এমিটার-বেস p-n জংশনকে সম্মুখী বায়াস ও কালেক্টর-বেস p-n জংশনকে বিমুখী বায়াস দেওয়া হয় (১ নম্বর চিত্র দেখ)। এর ফলে p+ এমিটর থেকে হোল বেসের দিকে এবং n-টাইপ বেস থেকে ইলেকট্রন এমিটরের দিকে প্রবাহিত হয়। ইলেকট্রন ও হোলের এই প্রবাহের ফলে এমিটর থেকে বেসের দিকে তড়িৎ প্রবাহ হয় যাকে আমরা বলব এমিটর কারেন্ট । সুতরাং এমিটর কারেন্টের মূলত দুটি উপাদান আছে – একটি এমিটর থেকে বেসের দিকে হোলের প্রবাহ, যাকে আমরা নাম দেব
, এবং অপরটি হল বেস থেকে এমিটরের দিকে ইলেকট্রনের প্রবাহ, যার নাম
। সুতরাং,
(1)
সাধারণত বেসের প্রস্থ বা বেধ এমিটরের থেকে অনেক কম এবং ওতে ইলেকট্রনের ঘনত্ব বা ডোপিংয়ের মাত্রা p+ এমিটরের থেকে অনেক কম রাখা হয়, যার দরুন । যেহেতু কালেক্টর-বেস জংশন বিমুখী বায়াস দেওয়া হয়েছে, সুতরাং কালেক্টরের বিভব বা পোটেনশিয়াল বেসের পোটেনশিয়ালের থেকে কম। এর ফলে যে ইলেকট্রিক-ফিল্ড বা তড়িৎ-ক্ষেত্র তৈরি হয় তাতে এমিটর থেকে বেসে পৌছনো হোলগুলো দ্রুত বেস থেকে কালেক্টরে চলে যায় এবং সেখান থেকে কালেক্টরের সঙ্গে যুক্ত তড়িৎ-দ্বারের মাধ্যমে ব্যাটারিতে পৌছে যায়। এই তড়িৎ প্রবাহকে বলা হয় কালেক্টর কারেন্ট
। এমিটর থেকে যতগুলো হোল বেসে যায় তার সবগুলো কিন্তু কালেক্টরে পৌছাতে পারেনা। কারণ কিছু হোল n-টাইপ বেসে অবস্থিত ইলেকট্রনের সাথে পুনর্মিলিত (recombine) হয়। বেসে এই ইলেকট্রন ও হোলের পুনর্মিলন রোধ করবার জন্যই ওর বেধ বা প্রস্থ এবং n-টাইপ ডোপিংয়ের মাত্রা খুবই কম রাখা হয় (যাতে সেখানে খুব কম পরিমানে ইলেকট্রন থাকে)। এর ফলে যতগুলো হোল এমিটর থেকে বেসে পৌছয় তার বেশিরভাগই কালেক্টরে চলে যেতে পারে [বেধ সরু করলে হোলগুলি দ্রুত বেসের সেই বেধ পার হয়ে যেতে পারবে। আর কম ডোপিং করলে বেসে খুব কম সংখ্যক ইলেকট্রন থাকবে পুনর্মিলনের জন্য। ]। অর্থাৎ কালেক্টর কারেন্ট ও এমিটর কারেন্ট প্রায় সমান (
)। এইখানে কিন্তু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মজাদার ব্যাপার ঘটে। এমিটর-বেস জংশনে যেহেতু সম্মুখী বায়াস দেওয়া থাকে তাই ওর রোধ (resistance) কিন্তু অত্যন্ত কম। অপরপক্ষে কালেক্টর-বেস জংশনে বিমুখী বা রিভার্স বায়াস থাকার দরুন ওর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত কারেন্টের মান কালেক্টর-বেস জংশনের ভোল্টেজের উপর নির্ভর করেনা (রিভার্স ডায়োডের I-V বৈশিষ্ট মনে কর)। সুতরাং কালেক্টর ও বেসের মাঝে অপর কোন অতিরিক্ত রোধ (load resistance) লাগালেও ওই বর্তনীতে (circuit) কারেন্টের মানের কোন পরিবর্তন হবেনা (লোডে ভোল্টেজ ড্রপের ফলে কালেক্টর-বেস জংশনের রিভার্স বায়াস কম হলেও তাতে কালেক্টর কারেন্ট একই থাকবে)। তাই ট্রানজিস্টার একটি আদর্শ কারেন্ট সোর্স (current source) রূপে কাজ করতে পারে। যদি কালেক্টর-বেস বর্তনীতে একটি উচ্চ মানের লোড রোধ (load resistance) লাগানো হয় তবে তার মধ্যে দিয়েও
কারেন্ট প্রবাহিত হবে (যতক্ষণ এমিটর-বেস ও কালেক্টর-বেস জংশন যথাক্রমে সম্মুখী ও বিমুখী বায়াস আছে)। সুতরাং ট্রানজিস্টার ব্যবহার করে একটি স্বল্প রোধ যুক্ত বর্তনী (এমিটর-বেস) থেকে মানের প্রায় কোন পরিবর্তন না ঘটিয়ে তড়িৎ প্রবাহ বা কারেন্ট একটি উচ্চ রোধ যুক্ত বর্তনীতে (কালেক্টর-বেস) প্রেরণ করা সম্ভব। ফলে ভোল্টেজ গেইন পাওয়া যেতে পারে। ১ নম্বর ছবিতে,
সুতরাং ভোল্টেজ গেইন
যেহেতু রাখা যেতেই পারে, তাই
।
এবারে আমরা দেখব কিভাবে ট্রানজিস্টারে কারেন্ট গেইন পাওয়া যায় এবং কিভাবে ট্রানজিস্টার পরিবর্ধক বা amplifier রূপে কাজ করে। তার জন্য বেসের সঙ্গে যুক্ত তড়িৎ-দ্বারের মধ্যে দিয়ে যে তড়িৎ প্রবাহ হয়, যাকে আমরা বেস কারেন্ট বলব, তার প্রকৃতি আমাদের জানতে হবে। বেস কারেন্টের মুখ্যত দুটি অংশ থাকে। একটির সাথে তোমরা আগেই পরিচিত হয়েছো। সেটা হল বেস থেকে এমিটরে ইলেকট্রনের প্রবাহের দরুন সৃষ্ট কারেন্ট (
)। বেস কারেন্টের অপর উপাদান বেসের মধ্যে ইলেকট্রন ও হোলের পুনর্মিলনের ফলে সৃষ্ট তড়িৎ প্রবাহ। যেহেতু কিছু সংখ্যক ইলেকট্রন বেসের মধ্যে হোলের সাথে পুনর্মিলিত হয়, তাই ব্যাটারি থেকে সেই সংখ্যক ইলেকট্রন আবার বেসের মধ্যে সরবরাহ করতেই হবে। এই ইলেকট্রন সরবরাহের ফলে যে কারেন্ট তৈরি হয় তাকে বলা হয় পুনর্মিলন প্রবাহ বা recombination current (
)। সুতরাং,
(2)
এবারে দেখতে হবে এমিটর কারেন্টের কতটা অংশ কালেক্টরে পৌছয়। আগেই বলেছি যে এমিটর থেকে বেসে পৌছানো হোলগুলোই শুধু কালেক্টরে পৌছে কালেক্টর কারেন্ট গঠন করতে পারে। কিন্তু বেসের মধ্যে যেহেতু কিছু সংখ্যক হোল ইলেকট্রনের সাথে পুনর্মিলিত হয় তাই,
(3)
(2) ও (3) নম্বর সমীকরণকে পরষ্পরের সাথে যোগ করে,
(4)
বা, (5)
আমাদের আগের অনুচ্ছেদের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে , সুতরা
।
-কে বলা হয় বেস থেকে কালেক্টরে কারেন্ট গেইন বা কারেন্ট এমপ্লিফিকেশন ফ্যাক্টর (current amplification factor)। সুতরাং কালেক্টর কারেন্ট বেস কারেন্টের থেকে অনেক গুণ বেশি। সেজন্য বেস কারেন্ট পরিবর্তন করলে যদি কালেক্টর কারেন্টেরও পরিবর্তন হয় তবে আমরা ট্রানজিস্টারকে এমপ্লিফায়ার বা পরিবর্দ্ধক হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। পরবর্তি অনুচ্ছেদে আমরা সেটাই দেখাবো।
সাম্যাবস্থায় ট্রানজিস্টারের প্রতিটি অংশে মোট চার্জ বা আধান শূন্য হতে হবে। ট্রানজিস্টার যখন কাজ করে তখন এমিটর থেকে ধনাত্মক আধান বিশিষ্ট হোলগুলি বেসের মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে অতিরিক্ত ধনাত্মক চার্জ দেয়। এই অতিরিক্ত ধনাত্মক আধানকে প্রশমিত করার জন্য ব্যাটারি থেকে অবশ্যই কিছু ইলেকট্রনকে বেসে প্রবেশ করতে হবে (হোলের সাথে পুনর্মিলনের জন্য)। যদি বেসের মধ্যে হোলের গড় আয়ু বা লাইফ টাইম হয় ও বেসের প্রস্থ বা বেধ পার হতে প্রত্যেকটি হোলের গড়ে
সময় লাগে [বেসের বেধ এতটাই সরু করা হয় যে
], তবে ব্যাটারি থেকে হোল প্রশমনের জন্য আগত অতিরিক্ত ইলেকট্রনকেও বেসের মধ্যে
সময় অপেক্ষা করতে হবে হোলের সাথে পুনর্মিলনের জন্য। এই
সময়ে
সংখ্যক হোল বেসের মধ্যে দিয়ে এমিটর থেকে কালেক্টরে পার হয়ে যেতে পারে। সুতরাং কার্যকারীভাবে এক একটি ইলেকট্রন ,
সংখ্যক হোলকে প্রশমিত করতে সক্ষম। আগেই বলেছি ইলেকট্রন-হোল পুনর্মিলনের ফলে যে কারেন্ট তৈরি হয় তা
। সুতরাং কালেক্টর কারেন্ট হবে
। যদি ধরে নেওয়া যায় যে
, তবে (2) নং সমীকরণ থেকে
এবং,
(6)
যদি বেস কারেন্ট কে প্রবাহিত হতে বাধা দেওয়া হয় তবে বেসের মধ্যে অতিরিক্ত হোল সঞ্চয়ের দরুন যে অতিরিক্ত বিভব তৈরি হবে তা এমিটর থেক বেসে হোলের প্রবাহতে বাধার সৃষ্টি করে কালেক্টর কারেন্ট কমিয়ে দেবে। অর্থাৎ বেস কারেন্ট কমালে কালেক্টর কারেন্ট কমে যাবে এবং বেস কারেন্ট বাড়ালে কালেক্টর কারেন্ট বেড়ে যাবে। সুতরাং বেস কারেন্টর মাধ্যমে কালেক্টর কারেন্টকে নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব। এই জন্যই বলা হয়ে থকে যে p-n-p বা n-p-n ট্রানজিস্টার হল কারেন্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (current controlled device)। যদি বেসে একটি AC সিগন্যাল বা কারেন্ট পাঠানো যায় তবে সেই কারেন্টের মানের উপর নির্ভর করে কালেক্টর কারেন্টও পরিবর্তিত হবে। আর যেহেতু কালেক্টর কারেন্টের মান বেস কারেন্টের থেকে
গুণ বেশি [(5) নং সমীকরণ], তাই কালেক্টর কারেন্টের পরিবর্তনও বেস কারেন্টের থেকে
গুণ বেশি হবে। এটাই সিগন্যাল পরিবর্ধন (signal amplification)।
(7)
২ নম্বর ছবিতে একটি সহজ বর্তনী দেখানো হয়েছে যা পরিবর্ধক রূপে কাজ করতে পারে। এই বর্তনীকে বলা হয় কমন এমিটর বর্তনী। এখানে উপযুক্ত বায়াস দিয়ে বেস কারেন্ট নিয়ন্ত্রন করা যায়। কালেক্টর কারেন্ট (5) ও (7) নম্বর সমীকরণ থেকে বের করা সম্ভব।


bah… Darunn.. Notun topic e lekha peye valo laglo
ধন্যবাদ সূজয়। আরও একটি নতুন বিষয়ের উপর লেখা আসছে। পরের পোস্টের উপর চোখ রাখ। আশা করি ভালো লাগবে।
please write about on working of n-p-n transistor.
তোমার অনুরোধ অনুসারে n-p-n ট্রানজিস্টারের উপর লেখা চলছে।