লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনের ফলে (ম্যাক্সওয়েলর সমীকরণ থেকে প্রাপ্ত) তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ অপরিবর্তিত থাকে – এর প্রমাণ তোমরা আগের পোস্টে দেখেছো। এটাও দেখেছো যে গ্যালেলিয়ান আপেক্ষিকতা নিউটনের সূত্রগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও তা ম্যাক্সওয়েলর তত্ত্বের ক্ষেত্রে একেবারেই ব্যার্থ। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আইনস্টাইনের সামনে দুটো রাস্তা ছিল। এক, তিনি ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব ও লোরেন্ৎস রূপান্তরণের সমীকরণকে সত্যি বলে ধরে নিয়ে সেই অনুসারে নিউটনের সূত্রের সংশোধন করতে পারতেন, অথবা দুই, নিউটনের সূত্র ও গ্যালেলিয়ান আপেক্ষিকতাকে সত্যি বলে ধরে নিয়ে সেই হিসেবে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বের পরিবর্তন সাধন করতে পারতেন। তিনি প্রথম রাস্তাটাই বেছে নিয়েছিলেন। এর কারণ ছিল ওই সময়কার কিছু পরীক্ষার ফল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মাইকেলসন-মোর্লের পরীক্ষা, যার ফলাফল ব্যাখ্যা করার একমাত্র উপায় ছিল এটা ধরে নেওয়া যে আলোর বেগ সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমে একই থাকে। সুতরাং আইনস্টাইন প্রথম রাস্তায় গিয়ে আপেক্ষিকতা সংক্রান্ত নিম্নলিখিত তত্ত্ব দিলেন যা বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ নামে পরিচিত। এখানে উল্লেখযোগ্য যে যদিও লোরেন্ৎস রূপান্তরণের সমীকরণ আইনস্টাইনের কাজের আগে থেকেই আবিষ্কৃত ছিল, কিন্তু আইনস্টাইনের আগে কেউই ওই সমীকরণের তাৎপর্য সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারেননি। তাই বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদকে মুখ্যত আইনস্টাইনের আবিষ্কার বলেই মেনে নেওয়া হয়। এই বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রধান দুটি মৌলিক স্বীকার্য বিষয় হল,
১) সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমে পদার্থবিদ্যার নিয়ম ও সূত্রগুলো একই রূপে কার্যকর থাকে।
২) শূন্যস্থাকে আলোর বেগ সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমেই সমান।
এই দুটি স্বীকার্য বিষয়কে স্বীকৃতি দিতে গেলে এটা মেনে নিতেই হয় যে এক ইনার্শিয়াল ফ্রেম থেকে অপর ইনার্শিয়াল ফ্রেমে স্থানাঙ্কের (cordinate) পরিবর্তন একমাত্র লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনের মাধ্যমেই হতে পারে। আগেই দেখেছো যে লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনের ফলে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ একই থাকে। সুতরাং সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমেই আলোর বেগ সমান হতেই হবে। আবার যেহেতু এই তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের থেকেই পাওয়া যায়, তাই এটাও সত্যি যে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বও লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনের ফলে অপরিবর্তিত থাকবে। বাস্তবিকই লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনের সমীকরণ ব্যবহার করে এটা স্পষ্টভাবে দেখানোও যায় যে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বের রূপ সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমে একi, শুধু গণনাটা একটু বেশি জটিল (পরে করে দেখাব)। যাইহোক, এরপর আইনস্টাইনের করণীয় ছিল নিউটনের গতিবিদ্যাকে এই বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা। এর পরের পোস্টে আমরা সেটা দেখব। আজ লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনের সমীকরণ বের করার অন্য আরেকটি পদ্ধতি তোমাদের বলব।
এর আগের পোস্টে আমরা তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ অপরিবর্তিত রাখতে পারে এমন রূপান্তরণ সমীকরণের খোজ করতে গিয়ে লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশন বের করেছিলাম। আর আজকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্যটি ব্যবহার করে দেখাবো কিভাবে এক ইনার্শিয়াল ফ্রেম থেকে অপর ইনার্শিয়াল ফ্রেমে ট্রান্সফর্মেশনের জন্য প্রয়োজনীয় সমীকরণ গণনা করা যায়। আমরা আগের দিনের মতই ধরে নেব যে এবং
হল দুটি ইনার্শিয়াল ফ্রেম যেখানে
ফ্রেম
এর সাপেক্ষে ধনাত্মক
অক্ষ বরাবর
বেগে ছুটছে। ধরা যাক
তে দুটি ফ্রেমের মূলবিন্দুই একই স্থানে ছিল। ওই সময়
ফ্রেমের মূলবিন্দুতে আলো জ্বাললে তা
সময় পরে যদি
বিন্দুতে পৌছায় তবে
ফ্রেমে
(1)
আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার শর্ত অনুসারে ফ্রেমেও আলোর বেগ
। অতএব এই ফ্রেমে যদি আলো
বিন্দুতে পৌঁছায় ও তার মধ্যে
সময় অতিক্রান্ত হয় তবে,
(2)
আমাদের উদ্দেশ্য হল (1) ও (2) নম্বর সমীকরণকে একসাথে সিদ্ধ করে ও
এর মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়। মনে কর,
(3)
[বিঃদ্রঃ রূপান্তরণের সমীকরণ একটি একঘাত বিশিষ্ট (linear) সমীকরণ। এর কারণ জানতে পোস্টের শেষে দেওয়া পাদটীকা দেখ। রূপান্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় কোফিসিয়েন্ট।]
তবে দুই নম্বর সমীকরণ থেকে,
(4)
(4) নং সমীকরণকে (1) নং সমীকরণের মত হতে হলে,
(5a)
আবার যেহেতু ফ্রেমের মূলবিন্দু
-তে
, তাই (3) নং সমীকরণ থেকে
(5b)
(5a) ও (5b) সমীকরণের সমাধান করে,
সুতরাং,
(6a)
(6b)
(6c)
অতএব আইনস্টাইনের দ্বিতীয় শর্ত লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনেরই অন্য রূপ মাত্র। একই রকমভাবে ফ্রেম থেকে
ফ্রেমে লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশনের সমীকরণ বের করলে দেখা যাবে,
(7a)
(7b)
(7c)
যেহেতু ফ্রেমের সাপেক্ষে
ফ্রেম
বেগে
অক্ষ বরাবর গতিশীল, তাই (6) নং সমীকরণে গতিবেগের যায়গায়
বসালেই
থেকে
ফ্রেমের লোরেন্ৎস রূপান্তরের সমীকরণ [(7) নং সমীকরণ] পাওয়া যায়।
লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশন ও গ্যালেলিয় ট্রান্সফর্মেশনের একটি মূল পার্থক্য এবারে এখানে আলোচনা করব। গ্যালেলিয় রূপান্তরণে সময় একটি স্বাধীন রাশি, স্থানের সঙ্গে যার কোন সম্পর্ক নেই। আরও স্পষ্ট করে বললে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্রই সময় একই ভাবে প্রবাহীত হয়। অপরপক্ষে লোরেন্ৎস রূপান্তরণে সময়কে স্থানের থেকে আলাদা করা যায়না; সময় ও স্থান প্রকৃতপক্ষে পরষ্পরের সাথে জড়িয়ে গেছে। সেজন্যই আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদে ত্রিমাত্রিক স্থান ও একমাত্রিক সময়কে মিলিয়ে একটি চতুর্মাত্রিক রাশি নির্ধারণ করা হয় যার নাম স্পেস-টাইম। স্থান ও কালের এই পরষ্পর নির্ভরতার ফলস্বরূপ এমন কিছু উদ্ভট ফলাফল পাওয়া যায় যা আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিরোধী। এই সম্মন্ধে এর পরের পোস্টে আরও আলোচনা করব। ভালো থেকো।
পাদটীকাঃ স্থানাঙ্ক রূপান্তরণে জন্য প্রয়োজনীয় সমীকরণের একঘাত বিশিষ্ট হওয়ার মূল কারণ দুটি। যদি ওই সমীকরণ একঘাত বিশিষ্ট না হয় তবে এক ইনার্শিয়াল ফ্রেম থেকে অন্য ইনার্শিয়াল ফ্রেমে গেলে ছদ্ম-বল কাজ করতে পারে। দ্বিতীয় কারণ হল একঘাত বিশিষ্ট না হলে এক ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমে যাওয়া ও তার বিপরীত ট্রান্সফর্মেশনের রূপ ভিন্ন হবে। নিচের উদাহরণ থেকে ব্যাপারটি বুঝতে সুবিধে হবে।
ধর ফ্রেম থেকে
ফ্রেমে যাওয়ার জন্য রূপান্তরণের সমীকরণ (যা সময়ের উপর একঘাত বিশিষ্ট নয়)
তবে,
সুতরাং একই প্রযুক্ত বলের জন্য দুটি ফ্রেমে বস্তুর ত্বরণ ভিন্ন হবে, যার অর্থ ফ্রেমে অবশ্যই একটি ছদ্ম-বল (pseudo force) কাজ করছে। তাই সেটা আর ইনার্শিয়াল রইল না। এবারে আরেকটি রূপান্তরণের সমীকরণ ধরা যাক যা সময়ের উপর একঘাত বিশিষ্ট কিন্তু
এর উপর নয়,
। তবে
। অর্থাৎ যে ট্রান্সফর্মেশনের মাধ্যমে
থেকে
ফ্রেমে যাওয়া যায় ঠিক সেরকম ট্রান্সফর্মেশন ব্যবহার করে
থেকে
ফ্রেমে যাওয়া যাচ্ছেনা। এটা আপেক্ষিকতার পরিপন্থি। সুতরাং আপেক্ষিতাবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপান্তরের সমীকরণকে অবশ্যই স্থান ও কাল, এই দুইয়েরই স্থানাঙ্কের উপর একঘাত বিশিষ্ট হতে হবে।
Durdanto post… Aro special relativity post er opekkay roilam