স্কেলার, ভেক্টর ও টেন্সর

যদি শিরনামে দেওয়া ওই তিন ভদ্রলোকের মধ্যে একজনের সম্মন্ধেও মনে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে পড়তে থাক! পদার্থবিদ্যায় এই তিনটি (এবং স্পাইনর নামের চতুর্থ একটি) বিষয় এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এগুলোকে ছাড়া পদার্থবিদ্যার চর্চাই সম্ভব নয়। আমাদের পরিচিত এবং অপরিচিত সমস্ত রাশি স্কেলার, ভেক্টর, টেন্সর ও স্পাইনর – এই চারটির মধ্যে অবশ্যই একটি। এদের মধ্যে স্কেলার ও ভেক্টর রাশি সম্মন্ধে মোটামুটি দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিজ্ঞান পড়েছে এমন সকলেই কিছু না কিছু জানে। কিন্তু বাকিদুটো অপেক্ষাকৃত অনেকটাই অপরিচিত, এবং অনেক সময়ই বিভ্রান্তির কারণ। তাই স্কেলার, ভেক্টর ও টেন্সর রাশি সম্মন্ধে একসাথে আলোচনা করলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে এই আশাতেই পোস্টটি করা হল। আর তাছাড়া এদের সম্মন্ধে একসাথে গোছানো আলোচনা থাকলে সেটাকে দরকারের সময় খুঁজে পাওয়াও সহজ। যাইহোক আর কথা না বাড়িয়ে মূল বিষয়ে প্রবেশ করা যাক। এদের মধ্যে সবথেকে সাধাসিধে হল স্কেলার, তো সেটা দিয়েই শুরু করছি।

স্কেলারঃ

নবম – দশম শ্রেণীর বইতে লেখা থাকে “যে সকল রাশির শুধুই মান আছে তারাই স্কেলার রাশি”। এটা একটা প্রাথমিক সংজ্ঞা। আরও একটু শুদ্ধ করে বললে বলতে হয় যে যে সকল রাশি শুধু একটিমাত্র বাস্তব সংখ্যা বা রিয়েল নাম্বার দিয়ে লেখা যায় তারাই হল স্কেলার রাশি। যেমন কোন বস্তুর আধান স্কেলার রাশির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আধান শুধু একটি ঋণাত্মক বা ধনাত্মক সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়। স্কেলারের আরও উদাহরণ একটু পরেই দেখতে পাবে। তার আগে স্কেলারের সবথেকে সঠিক সংজ্ঞাটা দেওয়া যাক। বলে রাখি প্রথমে আমরা ইউক্লিডিয় ত্রিমাত্রিক স্থান ও নিউটনের গতিবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত স্কেলার ও ভেক্টর রাশি সম্মন্ধে আলোচনা করব। এইরকম ত্রিমাত্রিক স্থানে কোঅর্ডিনেট সিস্টেমের বা ফ্রেমের (বা অক্ষের) ঘূর্ণনের মাধ্যমে স্থাণাঙ্ক রূপান্তরের পরেও যেসকল রাশির মান অপরিবর্তিত থাকে তারাই প্রকৃত স্কেলার রাশি। যেমন বস্তুর ভর, আধান, তাপমাত্রা, আয়তন, দৈর্ঘ্য ইত্যাদি ইউক্লিডিয় স্থানে স্কেলার রাশি।

ভেক্টরঃ

rotated-frame and vector bengali
চিত্র ১- পরষ্পরের সাথে theta কোণে আবর্তিত কোঅর্ডিনেট ফ্রেম। {\bf OP} হল সরণ ভেক্টর।

নির্দিষ্ট মান ও অভিমুখযুক্ত রাশিদের ভেক্টর রাশি বলা হয়। যেমন বল, ত্বরণ, গতিবেগ, সরণ ইত্যাদি ভেক্টর রাশির অতি পরিচিত উদাহরণ। যেহেতু ভেক্টরের একটি নির্দিষ্ট মান ও অভিমুখ থাকে তাই ভেক্টরকে কোঅর্ডিনেট সিস্টেমের মূলবিন্দু থেকে কোন নির্দিষ্ট দিকে একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তীরচিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ওই তীরচিহ্নের দৈর্ঘ্য হল ভেক্টরের মানের সমান এবং তীরচিহ্নের অভিমুখ হল ভেক্টরের অভিমুখ। এই তীরচিহ্নের একপ্রান্ত সর্বদাই মূলবিন্দুতে থাকে, সুতরাং শুধুমাত্র অপরপ্রান্তের (শেষপ্রান্তের) স্থানাঙ্ক জানা থাকলেই ভেক্টর আঁকা সম্ভব। তাই গণিতের ভাষায় ভেক্টর হল ক্রমে সাজানো একাধিক সংখ্যার সেট বা সমাহার (ordered set of \numbers), যা কোন কোঅর্ডিনেট সিস্টেমে ওই ভেক্টরের শেষপ্রান্তের স্থানাঙ্ক। ওই সংখ্যাগুলিকে বলা হয় ভেক্টরের উপাদান বা component। যেমন দ্বিমাত্রিক X - Y স্থানে কোন ভেক্টরের ({\bf A}) শেষ প্রান্তের স্থানাংক (A_x,A_y) হলে A_x এবং A_y হল যথাক্রমে XY অক্ষ বরাবর ওই ভেক্টরের উপাদান। (সাধারণত কোন ভেক্টরকে মোটা হরফে ছাপা হয়।) উপরে লেখা “ক্রমে সাজানো” কথাটি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ (a,b) এবং (b,a) কিন্তু দুটি ভিন্ন ভেক্টর প্রকাশ করে। এবারে অন্য আরেকটি উদাহরণ নিচ্ছি। মনে কর কোন ব্যক্তি X - Y কোঅর্ডিনেট সিস্টেমের মূলবিন্দু (O) থেকে যাত্রা শুরু করে P(x,y) বিন্দু পর্যন্ত গেল (১ নং চিত্র)। তাহলে {\bf OP} ভেক্টর ওই ব্যক্তির সরণ প্রকাশ করবে। এখন যদি X - Y অক্ষদুটিকে theta কোণে স্ক্রীনের উল্লম্ব অক্ষের সাপেক্ষে ঘুরিয়ে X' - Y' তে নিয়ে যাওয়া হয় তবে এই নতুন ফ্রেমের সাপেক্ষেও ওই ব্যক্তির সরণ {\bf OP} ভেক্টরই থাকবে। কারণ তা না হলে প্রাকৃতিক নিয়ম ওই দুটো পরষ্পরের সাপেক্ষে theta কোণে অবস্থিত ফ্রেমে ভিন্ন হবে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়, কারণ স্থান বা স্পেস হল আইসোট্রাপিক , অর্থাৎ স্পেসে সমস্ত দিকের প্রাধান্য সমান। তাই কোন বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত ফ্রেম থাকতে পারেনা, সব ফ্রেম পরষ্পরের সাথে সমতুল্য। অতএব {\bf OP} ভেক্টর দুটি ফ্রেমেই একই থাকবে। এই ঘটনাকে বলা হয় যে ভেক্টর কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের উপর নির্ভর করেনা (vector should be frame independent)। কিন্তু {\bf OP} ভেক্টর দুটি ফ্রেমে একই থাকলেও ১ নং ছবি থেকে স্পষ্ট যে ওর উপাদানসমূহ দুটি ফ্রেমে আর একই থাকতে পারেনা, কারণ P বিন্দুর স্থানাঙ্ক দুটি ফ্রেমে আলাদা। যদি X' - Y' ফ্রেমের সাপেক্ষে P বিন্দুর স্থানাঙ্ক (x',y') হয় তবে ছবি থেকে স্পষ্ট যে,

\displaystyle x' = x  text{cos}  theta + y  text{sin}  theta                 (1a)

\displaystyle y' = -x  text{sin} theta + y  text{cos} theta                (1b)

গাণিতিক সৌষ্ঠবের প্রয়োজনে আমরা (x,y) কে (x^1, x^2) এবং (x',y') কে (x'^1, x'^2) দিয়ে প্রকাশ করব। [x -এর উপরে সংখ্যাগুলি ওর ঘাত (power) নয়, সূচক (index)।] তাহলে (1) নং সমীকরণকে একটু সুষ্ঠুভাবে লিখলে,

\displaystyle x'^1 = x^1  text{cos}(theta) + x^2  text{sin}(theta) = a_{11}x^1 + a_{12}x^2                 (2a)

\displaystyle x'^2 = -x^1  text{sin}(theta) + x^2  text{cos}(theta) = -a_{21}x^1 + a_{22} x^2                (2b)

যেখানে, \displaystyle a_{ij} = \frac{\partial x'^i}{\partial x^j}, এবং i,  j = 1,  2। স্পষ্টতই, a_{11} = text{cos}(theta) = a_{22} এবং a_{12} = text{sin}(theta)= -a_{21}

অর্থাৎ কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের ঘূর্ণনের সাপেক্ষে ভেক্টরের অপরিবর্তনীয় থাকার শর্ত থেকে ওই ভেক্টরের উপাদানসমূহ কিভাবে ফ্রেমের ঘূর্ণনের ফলে পরিবর্তিত হয় তা (2) নং সমীকরণ থেকে বের করা যায়। মনে রাখবে যে ভেক্টরের উপাদানগুলো কিন্তু ফ্রেমের ঘূর্ণনের সাপেক্ষে অপরিবর্তনীয় থাকেনা, ভেক্টর অপরিবর্তিত থাকে। দ্বিমাত্রায় যেকেনো ভেক্টরের ({\bf A}) জন্য (2) নং সমীকরণ প্রযোজ্য। আমরা গাণিতিক সুবিধের জন্য XY অক্ষ বরাবর {\bf A} -এর উপাদান দুটিকে যথাক্রমে (A^1, A^2) দিয়ে লিখব। তাহলে,

\displaystyle A'^1 = A^1  text{cos}(theta) + A^2  text{sin}(theta)                 (3a)

\displaystyle A'^2 = -A^1  text{sin}(theta) + A^2  text{cos}(theta)                (3b)

দ্বিমাত্রায় যেকোন দুটি সংখ্যা (A^1, A^2) যদি ফ্রেমের ঘূর্ণনের ফলে (3) নং সমীকরণ অনুসারে পরিবর্তিত হয় তাহলে বলা হয় যে ওই সংখ্যাদুটি একটি ভেক্টর প্রকাশ করে। (2) নং সমীকরণ ব্যবহার করে (3) নং সমীকরণদুটিকে একটু সংহত ও সুষ্ঠুভাবে লিখলে,

\displaystyle A'^i = \sum_{j=1}^2 a_{ij}A^j = \sum_{j=1}^2 \frac{\partial x'^i}{\partial x^j} A^j  text{with } i,  j = 1,  2         (4)

একইভাবে ত্রিমাত্রায় যদি কোন তিনটি ক্রমে সাজানো সংখ্যা (A^1, A^2, A^3) ফ্রেমের ঘূর্ণেনের ফলে নিচে দেওয়া নিয়ামানুসারে পরিবর্তিত হয় তবে ওই তিনটি সংখ্যা একটি ভেক্টর প্রকাশ করবে।

\displaystyle A'^i = \sum_{j=1}^3 a_{ij}A^j = \sum_{j=1}^3 \frac{\partial x'^i}{\partial x^j} A^j  text{with } i,  j = 1,  2,  3         (5)

এবং n মাত্রাবিশিষ্ট স্থানে,

\displaystyle A'^i = \sum_{j=1}^n a_{ij}A^j = \sum_{j=1}^n \frac{\partial x'^i}{\partial x^j} A^j  text{with } i,  j = 1,  2,  3, ..... n         (6)

(6) নং সমীকরণকে বলা হয় ফ্রেমের আবর্তনের সাপেক্ষে ভেক্টর রূপান্তরণের সূত্র। যদি কোন ক্রমে সাজানো n -টি সংখ্যার সেট কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের ঘূর্ণনের ফলে এই রূপান্তরের সূত্র মেনে চলে তবে তাই হচ্ছে একটি n -মাত্রিক ভেক্টর। এটাই হচ্ছে ভেক্টরের প্রকৃষ্ঠ সংজ্ঞা। লক্ষ্য কর, কোন বিন্দুর স্থানাঙ্কের মতই ভেক্টরের উপাদানসমূহও কিন্তু কেবল কোন একটি নির্দিষ্ট কোঅর্ডিনেট সিস্টেমের সাপেক্ষেই লেখা সম্ভব। কোঅর্ডিনেট সিস্টেম উল্লেখ না করে শুধু ভেক্টরের উপাদান লেখা অর্থহীন।(5) নম্বর সমীকরণে প্রদত্ত ত্রিমাত্রিক ভেক্টরের উপাদানসমূহের রূপান্তরণের সূত্রকে আমরা মেট্রিক্স ব্যবহার করেও লিখতে পারি,

\displaystyle \left( begin{matrix} A'^1 \ A'^2 \ A'^3 end{matrix} \right) = \left( begin{matrix} a_{11} & a_{12} & a_{13} \ a_{21} & a_{22} & a_{23} \ a_{31} & a_{32} & a_{33} end{matrix} \right) \left( begin{matrix} A^1 \ A^2 \ A^3 end{matrix} \right)          (7)

এখানে বাদিকের স্তম্ভ মেট্রিক্সের মাধ্যমে আবর্তিত ফ্রেমে {\bf A} ভেক্টর এবং ডানদিকের স্তম্ভ মেট্রিক্সের মাধ্যমে মূল ফ্রেমে {\bf A} ভেক্টর প্রকাশ করা হয়। আর ওদের মাঝের স্কোয়ার মেট্রিক্সটি হল ফ্রেমের আবর্তনের বা ঘূর্ণনের জন্য প্রয়োজনীয় রূপান্তরণ মেট্রিক্স।

এখনও পর্যন্ত যে ভেক্টরগুলির সাথে পরিচিত হয়েছি তাদের উপাদান কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের ঘূর্ণনের ফলে অবস্থান ভেক্টরের উপাদানের মত করে ((2) নং সমীকরণ) পরিবর্তিত হয়। এরকম ভেক্টরের উপাদানগুলিকে উর্দ্ধসূচক ব্যবহার করে লেখা হয় এবং এদের নাম কনট্রাভ্যারিয়েন্ট ভেক্টর। এবারে আমরা অপর আরেক শ্রেণীর ভেক্টরের সাথে পরিচিত হব। তোমরা জানো যে কোন স্কেলার ফাংশনের গ্রেডিয়েন্ট হল একটি ভেক্টর। চল দেখা যাক ফ্রেমের আবর্তনের ফলে গ্রেডিয়েন্ট ভেক্টরের উপাদানগুলো কিভাবে পরিবর্তিত হয়। (আমরা ত্রিমাত্রায় মনোনিবেশ করব।) তোমরা আরও জানো যে কোন নির্দিষ্ট ফ্রেমে স্কেলার ফাংশন \phi এর গ্রেডিয়েন্টের ({\bf nabla \phi}) উপাদানসমূহ হল যথাক্রমে \displaystyle \frac{\partial \phi}{\partial x^1},  \frac{\partial \phi}{\partial x^2},  \frac{\partial \phi}{\partial x^3} । যদি আবর্তিত ফ্রেমে এই উপাদানগুলি যথাক্রমে \displaystyle \frac{\partial \phi'}{\partial x'^1},  \frac{\partial \phi'}{\partial x'^2},  \frac{\partial \phi'}{\partial x'^3}  হয় তবে যেহেতু \phi একটি স্কেলার রাশি, তাই \phi = \phi'। পার্শিয়াল ডেরিভেটিভের সূত্র ব্যবহার করে,

\displaystyle \frac{\partial \phi}{\partial x'^i} = \sum_j \frac{\partial \phi}{\partial x^j} \frac{\partial x^j}{\partial x'^i} =\sum_j \frac{\partial x^j}{\partial x'^i} \frac{\partial \phi}{\partial x^j}= \sum_j (a_{ij})^{-1} \frac{\partial \phi}{\partial x^j}        (8)

এই সমীকরণটিকে (6) নম্বর সমীকরণের সাথে তুলনা করলে দেখতে পাবে যে এটা ওর থেকে একটু আলাদা। ফ্রেমের আবর্তনের ফলে যে সকল ভেক্টরের উপাদান (8) নম্বর রূপান্তরণের সমীকরণ মেনে চলে তাদের বলা হয় কোভ্যারিয়েন্ট ভেক্টর। এইগুলোকে নিম্নসূচক ব্যবহার করে বোঝানো হয় এবং (8) নং সমীকরণকে সংক্ষেপে নিচের মত করে লেখা হয়,

\displaystyle \partial'_i \phi = \sum_j (a_{ij})^{-1} \partial_j\phi        (9)

যেখানে, \displaystyle \frac{\partial \phi}{\partial x'^i}=\partial'_i \phi এবং \displaystyle \frac{\partial \phi}{\partial x^i}=\partial_i \phi (9) নং সমীকরণ থেকে বোঝা যায় যে ফ্রেমের আবর্তনের ফলে কোভ্যারিয়েন্ট ভেক্টরের উপাদান কোন স্কেলার ফাংশনের গ্রেডিয়েন্টের উপাদানগুলির মত করে রূপান্তরিত হয়।

টেন্সরঃ

স্কেলার রাশির শুধুই মান থাকে, ভেক্টরের নির্দিষ্ট মান ও অভিমুখ থাকে। কিন্তু স্কেলার ও ভেক্টর ছাড়াও প্রকৃতিতে আরও এক ধরনের রাশি আছে যাদের মান ভিন্ন ভিন্ন দিকে আলাদা। এইগুলোকে বলা হয় টেন্সর রাশি। চল একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। তোমরা জানো কোন সরু তারের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ঘনত্ব (current density) ওই তারের মধ্যে তড়িৎ-ক্ষেত্রের সমানুপাতিক এবং এই সমানুপাতিকতার ধ্রুবককে বলা হয় ওই তারের পরিবাহিতা (conductivity)। যদি তড়িৎ প্রবাহের ঘনত্ব {\bf j} হয় এবং তড়িৎ ক্ষেত্র {\bf E} হয় তবে, {\bf j} = sigma {\bf E}, যেখানে sigma হল পরিবাহিতা, যা এখানে একটি স্কেলার, কারণ এর শুধু একটি নির্দিষ্ট মান আছে। কিন্তু যখন আমরা দুই বা ত্রিমাত্রিক পরিবাহির মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের অংক কষতে যাই তখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে পরিবাহিতাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট মান দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মনে কর X-Y তলে অবস্থিত একটি দ্বিমাত্রিক পরিবাহির মধ্যে যে তড়িৎ ক্ষেত্র ({\bf E}) প্রয়োগ করা হয়েছে তা X-Y, তলেই সীমাবদ্ধ। এছাড়াও ওই প্রবাহিতে Z অক্ষ বরাবর একটি চুম্বক ক্ষেত্রও ({\bf B}) প্রয়োগ করা হয়েছে। তাহলে এই যুগপৎ ক্ষেত্রের প্রভাবে পরিবাহিতে অবস্থিত ইলেকট্রনের গতির সমীকরণ হবে,

\displaystyle \frac{d{\bf v}}{dt}= \frac{-e}{m}({\bf E} + {\bf vtimes B}) - \frac{{\bf v}}{tau}

যেখানে v,  e,  m,  tau হল যথাক্রমে ইলেকট্রনের ড্রিফট গতিবেগ, আধান, ভর ও রিলাক্সেশন সময়। সাম্যাবস্থায় ইলেকট্রনের ড্রিফট গতিবেগ সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়না (d{\bf v}/dt = 0), অতএব,

\displaystyle \frac{e}{m} ({\bf E} + {\bf v times B}) + \frac{{\bf v}}{tau} =0          (10)

যেহেতু আমাদের পরিবাহিটি দ্বিমাত্রিক, অতএব {\bf v} equiv (v_x, v_y, 0)। এছাড়াও {\bf E} equiv (E_x, E_y, 0) এবং {\bf B} equiv (0, 0, B_z)। তাহলে (10) নং সমীকরণকে ভেক্টরের উপাদানে ভাগ করে লিখলে,

\displaystyle -v_x = \frac{etau}{m} (E_x + Bv_y)           (11)

\displaystyle -v_y = \frac{etau}{m} (E_y - Bv_x)           (12)

বলাই বাহুল্য যে এই দুটি সমীকরণ লিখতে গিয়ে আমাদেরকে {\bf vtimes B} এর মান বের করতে হয়েছে। (11) ও (12) নম্বর সমীকরণদুটিকে একটূ সাজিয়ে লিখলে,

\displaystyle v_x = \frac{etau/m}{(1+B^2e^2tau^2/m^2)}\left[-E_x + \frac{Betau}{m}E_y\right]

\displaystyle v_y = \frac{etau/m}{(1+B^2e^2tau^2/m^2)}\left[-\frac{Betau}{m}E_x - E_y\right]

এইদুটো সমীকরণকে মেট্রিক্স ব্যবহার করে লিখলে,

\displaystyle \left( begin{matrix} v_x \ v_y end{matrix} \right) = \frac{etau/m}{(1+B^2e^2tau^2/m^2)}\left( begin{matrix} -1 & Betau/m \ -Betau/m & -1end{matrix}\right) \left( begin{matrix} E_x \ E_y end{matrix}\right)                 (13)

তোমরা জানো যে কারেন্ট ঘনত্ব {\bf j} = -ne{\bf v}। অতএব,

\displaystyle \left( begin{matrix} j_x \ j_y end{matrix} \right) = \frac{ne^2tau/m}{(1+B^2e^2tau^2/m^2)}\left( begin{matrix} 1 & -Betau/m \ Betau/m & 1end{matrix}\right) \left( begin{matrix} E_x \ E_y end{matrix}\right)                 (14)

বা, \displaystyle {\bf j} = sigma {\bf E}                                                           (15)

যেখানে, \displaystyle sigma = \frac{ne^2tau/m}{(1+B^2e^2tau^2/m^2)}\left( begin{matrix} 1 & -Betau/m \ Betau/m & 1end{matrix}\right) equiv \left(begin{matrix} sigma_{xx} & sigma_{xy} \ sigma_{yx} & sigma_{yy}end{matrix} \right)

স্পষ্টতই (15) নম্বর সমীকরণের sigma আর একটি স্কেলার রাশি নয়, কারণ এর চারটি উপাদান রয়েছে। একইভাবে এটা ভেক্টরও নয়, কারণ একটি দ্বিমাত্রার ভেক্টরের কেবল দুটি উপাদান থাকতে পারে। sigma মেট্রিক্স থেকে বলা যেতে পারে যে X অক্ষ বরাবর তড়িৎ ক্ষেত্রের জন্য ওই দিকে পরিবাহিতা sigma_{xx}, Y অক্ষ বরাবর তড়িৎ ক্ষেত্রের জন্য ওই দিকে পরিবাহিতা sigma_{xy}। এছাড়াও sigma এর বাকিদুটি পদ sigma_{xy} এবং sigma_{yx} যথাক্রমে Y অক্ষ বরাবর তড়িৎ ক্ষেত্রের জন্য X অক্ষে পরিবাহিতা এবং X অক্ষ বরাবর তড়িৎ ক্ষেত্রের জন্য Y অক্ষে পরিবাহিতা বোঝায়। sigma হল আসলে একটি টেন্সরের উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে এটা দ্বিমাত্রিক স্থানে (two dimensional space) একটি দ্বিতীয় মাত্রার টেন্সর (second rank tensor)। কোন টেন্সরের উপাদানগুলিকে লিখতে যতগুলি সূচক প্রয়োজন তাকেই ওই টেন্সরের rank বা মাত্রা বলা হয়। সাধারণত N মাত্রাবিশিষ্ট স্থানে একটি n rank বিশিষ্ট টেন্সরের মোট উপাদানের সংখ্যা হবে N^n। যেমন ত্রিমাত্রিক স্থানে একটি দ্বিতীয় মাত্রার টেন্সরের উপাদানের সংখ্যা হল 9 টি। যেকোন N মাত্রাবিশিষ্ট স্থানে দ্বিতীয় মাত্রার টেন্সরকে সাধারণত একটি N times N মেট্রিক্সের মাধ্যমে লেখা হয়। এবারে আমরা টেন্সরের প্রচলিত সংজ্ঞা দেব।

মনে কর {\bf A} একটি দ্বিতীয় মাত্রার টেন্সর। তবে কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের ঘূর্ণনের ফলে ওই টেন্সরের উপাদানসমূহ যদি নিচে দেওয়া নিয়মানুসারে পরিবর্তিত হয়,

\displaystyle A'^{ij} = \sum_{kl} \frac{\partial x'^i}{\partial x^k} \frac{\partial x'^j}{\partial x^l} A^{kl}                          (16)

তবে {\bf A} কে বলা হয় কনট্রাভ্যারিয়েন্ট টেন্সর। একইভাবে কোন দ্বিমাত্রিক কোভ্যারিয়েন্ট টেন্সরের জন্য,

\displaystyle B'_{ij} = \sum_{kl} \frac{\partial x^k}{\partial x'^i} \frac{\partial x^l}{\partial x'^j} B_{kl}                          (17)

এবং মিশ্র দ্বিমাত্রিক টেন্সরের জন্য,

\displaystyle {C'}_j^i = \sum_{kl} \frac{\partial x'^i}{\partial x^k} \frac{\partial x^l}{\partial x'^j} C_l^k                          (18)

আগেই বলেছি, যেকোন দ্বিমাত্রিক টেন্সরকে একটি স্কোয়ার মেট্রিক্সের মাধ্যমে লেখা যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে যেকোন স্কোয়ার মেট্রিক্সই টেন্সর। শুধুমাত্র সেইসকল স্কোয়ার মেত্রিক্সই টেন্সর হবার যোগ্য যাদের উপাদানসমূহ কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের ঘূর্ণনের ফলে (16), (17), (18) – এদের মধ্যে কোন একটি সমীকরণ অনুসারে পরিবর্তিত হয়। সুতরাং টেন্সর হল এমন একাধিক ক্রমে সাজানো সংখ্যার সমাহার যারা ফ্রেমের আবর্তনের ফলে ওই সমীকরণগুলো মেনে রূপান্তরিত হয়। বলাই বাহুল্য যে ভেক্টরের মত এখানেও টেন্সরের উপাদানসমূহও কিন্তু কোন নির্দিষ্ট কোআর্ডিনেট ফ্রেমের সাপেক্ষেই লিখতে হবে। ভেক্টর ও স্কেলারকে টেন্সরের বিশেষ রূপ হিসেবে গন্য করা হয়। ভেক্টর হল একমাত্রিক টেন্সর (tensor of rank 1) এবং স্কেলার হল শূন্য মাত্রাবিশিষ্ট টেন্সর (tensor of rank 0)। কোন টেন্সরের উপাদানগুলোকে লিখতে যতগুলো সূচক প্রয়োজন সেটাই হল ওই টেন্সরের rank বা মাত্রা এবং ওই টেন্সরের উপাদানগুলির রূপান্তরণের সমীকরণে ঠিক ততগুলোই আংশিক ডেরিভেটিভ থাকবে। স্কেলার যেমন শুধু একটি সংখ্যা, ভেক্টর যেমন কিছু সংখ্যার একমাত্রিক সন্নিবেশ (one dimensional array) তেমনি টেন্সর হল কিছু সংখ্যার বহুমাত্রিক সন্নিবেশ (\multidimensional array) যারা কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের আবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট রূপান্তরণের সমীকরণ মেনে চলে।

এতক্ষণ আমরা শুধু ত্রিমাত্রিক ইউক্লিডিয় স্থান ও নিউটেনের গতিবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। কিন্তু তোমরা জানো যে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার জন্য প্রয়োজনীয় হল চতুর্মাত্রিক মিনকোভস্কি স্থান। সুতরাং স্কেলার, ভেক্টর ও টেন্সরের ধারণাকে এমনভাবে পরিবর্তিত করতে হবে যাতে তা মিনকোভস্কি স্থানেও প্রযোজ্য হয়। মিনকোভস্কি স্থানে স্কেলার রাশি একটি সংখ্যার মাধ্যমে লেখা হয় যার মান লোরেন্‍ৎস রূপান্তরণের ফলে অপরিবর্তিত থাকে। যেহেতু মিনকোভস্কি স্থান একটি চতুর্মাত্রিক স্থান তাই এখানে ভেক্টরের উপাদানের সংখ্যা স্বভাবতই হবে চারটি। অতএব এই চতুর্মাত্রিক স্থানে নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো চারটি সংখ্যা (A^{\mu}) যদি লোরেন্‍ৎস রূপান্তরণের ফলে নিচের সমীকরণ অনুসারে পরিবর্তিত হয় তবে বলা হয় যে ওই চারটি সংখ্যা একটি কনট্রাভ্যারিয়েন্ট ফোর ভেক্টর প্রকাশ করে।

\displaystyle A'^{\mu} = \sum_{\nu}\frac{\partial x'^{\mu}}{\partial x^{\nu}}A^{\nu}

একইভাবে কোভ্যারিয়েন্ট ফোর ভেক্টরের জন্যে,

\displaystyle B'_{\mu} = \sum_{\nu}\frac{\partial x^{\nu}}{\partial x'^{\mu}}B_{\nu}

যেখানে \mu,  \nu = 0,  1,  2,  3 এবং x'^{\mu}x^{\nu} পরষ্পরের সাথে লোরেন্‍ৎস রূপান্তরণের দ্বারা সম্পর্কযুক্ত।

ত্রিমাত্রিক ইউক্লিডিয় স্থানের মত মিনকোভস্কি স্থানেও টেন্সরের উপাদানসমূহের জন্য (16), (17) ও (18) নম্বর সমীকরণ প্রযোজ্য। শুধু এটুকু খেয়াল রাখতে হবে যে মিনকোভস্কি স্থানে i,  j=0,  1,  2,  3 এবং x'^{i}x^{j} পরষ্পরের সাথে লোরেন্‍ৎস রূপান্তরণের দ্বারা সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু এটা চতুর্মাত্রিক স্থান তাই এখানে কোন দ্বিতীয় মাত্রার টেন্সরের মোট উপাদানের সংখ্যা হল 16 টি।

তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে মিনকোভস্কি স্থানে কোঅর্ডিনেট ফ্রেমের কেবল স্থানে ঘূর্ণনের (only spatial rotation) ফলে ভেক্টর ও টেন্সরের উপাদানগুলি কিন্তু ত্রিমাত্রিক ইউক্লিডিয় স্থানের ভেক্টরের মত করেই রূপান্তরিত হয়। টেন্সরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট সম্মন্ধে এর পরের পোস্টে আরও আলোচনা করব। ভালো থেকো।

2 thoughts on “স্কেলার, ভেক্টর ও টেন্সর”

  1. অসাধারণ একটা পোস্ট । অনেক দিন ধরে এমনই সহজ সরল ভাষায় টেনসর খুঁজছিলাম । আপনাদের এই মহান উদ্যোগের কারনে বিষয়টা বাংলাতেই ভালভাবে জেনে গেলাম । আশা করি এখন সাধারন আপেক্ষিক তত্ত্ব এর গাণিতিক যুক্তি গুলো আগের থেকেও ভালোভাবে বুঝব 🙂 আপনাদের ধন্যবাদ । এবং টেনসরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আপনাদের পরবর্তী পোস্ট এর অপেক্ষায় আছি 🙂
    থ্যাংস এগেইন >

    1. তোমাকেও ধন্যবাদ। তোমরা পড় বলেই এই ব্লগের উদ্দেশ্য সফল হয়। পাঠক বন্ধুরা না থাকলে ব্লগ লেখাটাই অর্থহীন। ব্যাপারটা অনেকটা বিশ্বব্রহ্মান্ডের সাথে মানুষের সম্পর্কের মত। মানুষের মত বুদ্ধিমান জীবের আবির্ভাব না হলে এই বিশ্ব-চরাচর সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হয়তো বিফল হত। মানুষ এই বিশ্বের সৌন্দর্য দেখে অভিভুত হয়, এর রহস্য বোঝার চেষ্টা করে, তবেই না এত গ্রহ, নক্ষত্র, চাঁদ, আঁকাশ-গঙ্গা এইসবের সার্থকতা। 🙂
      আর বাংলা ভাষার মত এত সুন্দর ও মিষ্টি একটি ভাষায় উচ্চতর বিজ্ঞানের প্রচার করা অত্যন্ত আবশ্যিক। বাংলা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার, এই ভাষা যাতে অনেক, অনেকদিন টিকে থাকে তার জন্য আমাদের সকলেরই চেষ্টা করা উচিৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.