এই পোস্টের বিষয় গ্রীনের আইডেনটিটি (Green’s identities), স্থির তড়িৎ ক্ষেত্রে বাউন্ডারীর প্রভাব আলোচনার জন্য যা অপরিহার্য। পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধান করে কোন প্রদত্ত আধান ঘনত্বের প্রভাবে কোথায় কেমন পোটেনশিয়াল (বিভব) হবে সেটা বের করা সম্ভব। আবার তোমরা দেখেছো যে কুলম্বের সূত্র থেকেও কোন প্রদত্ত আধান ঘনত্বের ফলে তড়িৎ পোটেনশিয়াল নির্ণয় করা যায়। প্রকৃতপক্ষে কুলম্বের সূত্র থেকে যে পোটেনশিয়াল পাওয়া যায় সেটা পোয়াসোঁ সমীকরণের একটি বিশেষ সমাধান। অর্থাৎ, কুলম্ব পোটেনশিয়াল
…………..(1)
পোয়াসোঁর সমীকরণকে সিদ্ধ করে। এটা খুব সহজেই প্রমাণ করা যায়। (1) নম্বর সমীকরণের উভয়পার্শ্বে এর সাপেক্ষে ল্যাপলাসিয়ান অপারেটর প্রয়োগ করে,
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে উপরোক্ত প্রমাণটি বুঝতে হলে “তড়িৎ-চৌম্বকত্ব – কুলম্ব ও গাউসের সূত্র” পোস্টটি একটু পড়ে নেওয়া উচিৎ।
এবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে বলব। পোয়াসোঁ সমীকরণ হল একটি দ্বিতীয় ক্রমের পার্শ্বিয়াল ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ (second order \partial differential equation)। তোমরা হয়তো জানো যে এই ধরনের সমীকরণের পূর্ণ সমাধান করতে হলে আমাদের দরকার বাউন্ডারী (সীমানা) শর্ত (boundary condition)। বাউন্ডারী শর্ত সম্মন্ধে আমরা এর পরের পোস্টে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। তবে এখন এটুকু বলে রাখছি যে বাউন্ডারী বা সীমানা হল কোন অঞ্চলকে আবদ্ধকারী এমন একটি তল (ত্রিমাত্রায়) বা রেখা (দ্বিমাত্রায়) যেখানে তড়িৎ বিভব (পোটেনশিয়াল) কিংবা তড়িৎ ক্ষেত্রের মান আমাদের জানা আছে। বাউন্ডারী শর্ত পোয়াসোঁ সমীকরণ সমাধানের জন্য অপরিহার্য। সত্যি কথা বলতে গেলে কোন অঞ্চলে তড়িৎ বিভব কেমন হবে সেটা যেমন নির্ভর করে আধান ঘনত্বের উপর, তেমনি সেটা প্রদত্ত বাউন্ডারী শর্তের উপরেও নির্ভর করে। একই প্রদত্ত আধান ঘনত্বের জন্য বাউন্ডারী শর্তের উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন সমাধান হতে পারে। আমারা উপরে দেখিয়েছি যে কুলম্বের সূত্র থেকে তড়িৎ বিভব বা পোটেনশিয়ালের যে রাশিমালা পাওয়া যায় তা পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধান। তাহলে বলতো ওই সমাধানের জন্য বাউন্ডারী শর্ত কি ছিল? ঠিক ধরেছ, ওই ক্ষেত্রে বাউন্ডারী শর্ত ছিল । অর্থাৎ বাউন্ডারী অবস্থিত অসীম দূরত্বে এবং ওই বাউন্ডারীতে বিভবের মান শূন্য। যদি বাস্তবে তড়িৎ ক্ষেত্র সংক্রান্ত সমস্যায় বাউন্ডারী সর্বদা অসীম দূরত্বে থাকত তবে এই মূহুর্তেই আমাদের স্থির তড়িৎ সম্মন্ধে আলোচনা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু সৌভাগ্যবশত সেটা হয়না। তাই আমার মত কিছু অর্ধোন্মাদ নিজের ট্যাঁকের পয়সা খরচ করে এভাবে রাত জেগে জেগে এইসব খটমট বিষয় নিয়ে কচকচ করতে পারে! যাইহোক বাউন্ডারী থাকে বলেই ফিজিক্স এত মজাদার, এত বর্ণময়। বাইন্ডারী না থাকলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বই থাকতো না। [এই ব্যাপারটা হয়তো ব্রিটিশ শাষনের শেষকালে এই উপমহাদেশের নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন; আর তাই এক অখণ্ড জাতিকে ত্রিখণ্ডে ভাগ করতে দু-দুটো বাউন্ডারী (সীমারেখা) সৃষ্টি হল! ফলস্বরূপ প্রায় ৭০ শতাংশ দেশবাসীকে অর্ধাহারে রেখে দেশের নেতারা বাউন্ডারী রক্ষা করতে বিদেশ থেকে কোটি-কোটি টাকার অস্ত্র কিনতে পারেন। যাইহোক রাজনীতির রঙ লাগিয়ে অযথা সময় নষ্ট করা অনুচিৎ। তাই আমরা মানব জাতির উপর বাউন্ডারীর প্রভাবের পরিবর্তে পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধানে কি করে সসীম দূরত্বে অবস্থিত বাউন্ডারীর প্রভাব নির্ণয় করা যায় এবারে সেটাই আলোচনা করব।]
গ্রীনের আইডেনটিটি (Green’s identities)

সসীম দূরত্বে অবস্থিত বাউন্ডারীর প্রভাব পোয়াসোঁ সমীকরণের সমাধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পদার্থবিদ জর্জ গ্রীন ১৮২৮ সালে দুটো সমীকরণ আবিষ্কার করেন যা গ্রীনের আইডেনটিটি নামে পরিচিত। এই আবিষ্কার সত্যিই অসাধারণ। এবারে সেটাই বলছি তোমাদের। ভেক্টর ক্যালকুলাসের ডাইভার্জেন্স তত্ব থেকে নিশ্চয় জানো যে,
………….(2)
যেখানে তল দ্বারা আবদ্ধ
আয়তনে
একটি ভেক্টর। এবারে আমরা ধরে নেব যে
, যেখানে
ও
যেকোন দুটি স্কেলার ফাংশন। মনে রাখবে যে
হল একটি ভেক্টর। অতএব,
………..(3a)
এবং,
……………..(3b)
হল
তলের অভিমুখে একক ভেক্টর। মনে রাখবে কোন বিন্দুতে কোন তলের অভিমুখ হল ওই বিন্দুতে তলের উপর অঙ্কিত বহির্মুখি লম্বের অভিমুখ। (3b) সমীকরণ আহরণ করতে গিয়ে আমরা দুটো ভেক্টরের ডট বা স্কেলার গুণনের বৈশিষ্ট ব্যবহার করেছি। পুনশ্চ বলতে গেলে
, যেখানে
হল
ভেক্টরের অভিমুখে
ভেক্টরের উপাদান, যাকে
এর উপর
এর প্রোজেকশন বা অভিক্ষেপ বলা হয়। একইভাবে (3b) সমীকরণে
হল
তলের অভিমুখে
-এর উপাদান, যার পোষাকী নাম হল
তলের উপর
-এর নর্মাল গ্রেডিয়েন্ট। (2) ও (3) নং সমীকরণ একত্রে ব্যবহার করে,
যদি ও
,
স্থানাঙ্কের ফাংশন হয় তবে আমরা উপরের সমীকরণটিকে স্পষ্টভাবে লিখে পাই,
………………..(4)
এটাই হল গ্রীনের প্রথম আইডেনটিটি (Green’s first identity)। একইভাবে যদি আমরা ধরে নেই যে , তবে,
………………..(5)
(4) – (5) করে,
…………(6)
এটা হল গ্রীনের বিখ্যাত দ্বিতীয় আইডেনটিটি (Green’s second identity)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এখানে ল্যাপলাসিয়ান অপারেটর এর সাপেক্ষে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই আইডেনটিটি ব্যবহার করে এবারে সহজেই সসীম বাউন্ডারীর প্রভাব পোয়াসোঁর সমীকরণে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তার জন্যে মনে কর যে
, অর্থাৎ
স্কেলার পোটেনশিয়াল পোয়াসোঁর সমীকরণ মেনে চলে এবং
।
হল সেই বিন্দু যেখানে পোয়াসোঁর সমীকরণ সমাধান করে আমরা তড়িৎ বিভব নির্ণয় করতে চাই। তাহলে, এই পোস্টের শুরুতেই দেখিয়েছি যে,
। অতএব গ্রীনের দ্বিতীয় আইডেনটিটি থেকে,
বা,
যদি বিন্দু ইন্টিগ্রেশন যে অঞ্চলে করা হচ্ছে (
) তার মধ্যেই থাকে তবে ডেল্টা ফাংশনের বৈশিষ্ট ব্যবহার করে,
বা, ..(7)
এই সমীকরণের ডানদিকের প্রথম পদটি কুলম্বের সূত্র। কিন্তু দ্বিতীয় পদটি হল একটি সারফেস ইন্টিগ্রাল যার মান নির্ভর করে বাউন্ডারীতে () পোটেনশিয়াল
এবং তার নর্মাল গ্রেডিয়েন্টের (
, যা মূলত তড়িৎ ক্ষেত্র) মানের উপর। এদেরকেই বলা হয় বাউন্ডারী শর্ত। যদি মনে কর যে বাউন্ডারী অসীম দূরত্বে অবস্থিত, তবে স্পষ্টতই সারফেস ইন্টিগ্রালটির মান শূন্য এবং আমরা কুলম্বের সূত্র থেকে প্রাপ্ত পোটেনশিয়াল ফেরত পেয়ে যাচ্ছি। অপরপক্ষে সসীম (finite) দূরত্বে অবস্থিত বাউন্ডারীর জন্য বাউন্ডারী শর্ত ব্যবহার করে ওই বাউন্ডারীর উপর সারফেস ইন্টিগ্রালের মান নির্ণয় করতে হবে। মোদ্দা কথা হল যে উপরোক্ত সমীকরণের ডানদিকের প্রথম পদটি আধান ঘনত্বের প্রভাব এবং দ্বিতীয় পদটি সসীম বাউন্ডারী বা সীমানার প্রভাব ব্যক্ত করে। অর্থাৎ গ্রীনের আইডেনটিটি এবং ডেল্টা ফাংশনের বৈশিষ্ট ব্যবহার করে আমরা স্থির তড়িৎ ক্ষেত্রের উপর সসীম বাউন্ডারীর প্রভাব গণনা করতে সক্ষম হয়েছি। (7) নম্বর সমীকরণ থেকে আরও একটি মজাদার বিষয় জানা যায়। লক্ষ্য কর যে ইন্টিগ্রেশন যে অঞ্চলে (
) করা হচ্ছে সেখানে যদি আধানের ঘনত্ব শূন্য হয় তবে সেই অঞ্চলে তড়িৎ বিভব বা পোটেনশিয়ালের মান কেবল ওই অঞ্চলের বাউন্ডারীর বিভব এবং তার নর্মাল গ্রেডিয়েন্টের উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ ওই অঞ্চলের তড়িৎ বিভব কেবলমাত্র বাউন্ডারী শর্তের উপর নির্ভরশীল। এখানে বলে রাখছি (7) নম্বর সমীকরণ হল পোয়াসোঁর সমীকরণের সমাধানে গ্রীনের ফাংশন (Green’s function) ব্যবহারের একটি উদাহরণ এবং
হল একটি বিশেষ গ্রীনের ফাংশন, যাকে বলা হয় সীমানাহীন শূন্যস্থানের গ্ৰীনের ফাংশন (Green’s function of unbounded free space)।
আজ এ পর্যন্তই রইল। এর পরের পোস্টে আমরা বাউন্ডারী শর্ত সম্মন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করব। গ্রীনের আইডেনটিটি, বাউন্ডারীর প্রভাব এবং তড়িৎ-চৌম্বকত্ব সম্মন্ধে ভালভাবে জানতে কয়েকটি প্রয়োজনীয় বইয়ের লিঙ্ক নিচে দেওয়া হল। যথাক্রমে Jackson, Griffiths এবং Franklin এর লেখা এই বইগুলি তড়িৎ-চৌম্বকত্ব শিক্ষার জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও গ্রীনের আইডেনটিটি সম্মন্ধে আরও অনেক তথ্য wikipedia থেকেও জানতে পার।
দেশী ফিজিক্সের সব লেখা আমি ও আমার বন্ধুরা ফলো করছি।আমি নিজে যদিও পদার্থবিদ্যার ছাত্র নই,তবু বেশ কিছু টপিক্স আমার ফিল্ডের সাথে মিলে যাওয়ায় আগ্রহ নিয়ে পড়ছি। বাংলায় এর চেয়ে ভাল সাইট আর দেখিনি কিন্তু।অসংখ্য ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ শমীক। এত ভাল কমেন্ট পেলে সত্যিই ভালো লাগে।