n-p-n ট্রানজিস্টার – গঠন ও কার্যপ্রণালী (প্রশ্নোত্তর)

n-p-n ট্রানজিস্টারের গঠন ও কার্যপ্রণালী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব এই পোস্টে। p-n-p ট্রানজিস্টার সম্মন্ধে আমারা আগেই বলেছি। ঘটনা হল যে যদি p-n-p ট্রানজিস্টারের কার্যপ্রনালী কেউ ভাল করে বুঝে থাকে তবে তার পক্ষে n-p-n ট্রানজিস্টার কিভাবে কাজ করে সেটা বোঝা খুবই সরল; শুধু ইলেকট্রন-হোল এবং তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ উল্টে দিলেই হল। তাই n-p-n ট্রানজিস্টার সংক্রান্ত এই আলোচনা অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত রাখব। অনুরোধ, এই পোস্টটি পড়ার আগে একবার p-n-p ট্রানজিস্টার বিষয়ক আলোচনাটি একবার পড়ে নাও। নিচে n-p-n ট্রানজিস্টারের একটি রেখাচিত্র দেখানো হল।

n-p-n transitor bengali-n-p-n ট্রানজিস্টার
চিত্র ১- n-p-n ট্রানজিস্টারের বায়াসিং ও তাতে তড়িৎ প্রবাহ।

n-p-n ট্রানজিস্টার ও তার কার্যপ্রণালী

n-p-n ট্রানজিস্টরকে দুটি p-n জংশন ডায়োডের সমন্বয় হিসেবে ধরা যেতে পারে যাদের p অঞ্চলদুটিকে পরষ্পরের সাথে জোড়া হয়েছে। n-p-n ট্রানজিস্টরের দুটি n অঞ্চলের মধ্যে একটিতে অপরটির তুলনায় ইলেকট্রনের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে, যাকে বলা হয় এমিটর। এমিটর নামটি থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এটা থেকে ইলেকট্রন নিসৃত হয়। ১ নম্বর ছবিতে এমিটরকে n+ চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়েছে। এর মানে হল খুব বেশি করে ডোপ করা n-টাইপ সেমিকন্ডাকটর। তুলনামুলকভাবে কম পরিমানে ইলেকট্রনের ঘনত্ব যুক্ত অপর n-টাইপ অঞ্চলটিকে বলা হয় কালেক্টর বা সংগ্রাহক। আর মধ্যিখানের p-টাইপ অঞ্চলের নাম হল বেস। সাধারণত এমিটার-বেস p-n জংশনকে সম্মুখী বায়াস ও কালেক্টর-বেস p-n জংশনকে বিমুখী বায়াস দেওয়া হয় (১ নম্বর চিত্র দেখ)। এর ফলে n+ এমিটর থেকে ইলেকট্রন বেসের দিকে এবং p-টাইপ বেস থেকে হোল এমিটরের দিকে প্রবাহিত হয়। ইলেকট্রন ও হোলের এই প্রবাহের ফলে বেস থেকে এমিটরের দিকে তড়িৎ প্রবাহ হয় যাকে আমরা বলব এমিটর কারেন্ট I_E। সুতরাং এমিটর কারেন্টের মূলত দুটি উপাদান আছে – একটি এমিটর থেকে বেসের দিকে ইলেকট্রনের প্রবাহ, যাকে আমরা নাম দেব I_{En}, এবং অপরটি হল বেস থেকে এমিটরের দিকে হোলের প্রবাহ, যার নাম I_{Ep}

\displaystyle I_E = I_{En} + I_{Ep} ……………………….(1)

সাধারণত বেসের প্রস্থ বা বেধ এমিটরের থেকে অনেক কম এবং ওতে হোলের ঘনত্ব বা ডোপিংয়ের মাত্রা n+ এমিটরে ইলেকট্রনের ঘনত্বের থেকে অনেক কম রাখা হয়, যার দরুন I_{En} >> I_{Ep}। যেহেতু কালেক্টর-বেস জংশন বিমুখী বায়াস দেওয়া হয়েছে, সুতরাং কালেক্টরের বিভব বা পোটেনশিয়াল বেসের পোটেনশিয়ালের থেকে বেশি। এর ফলে যে ইলেকট্রিক-ফিল্ড বা তড়িৎ-ক্ষেত্র তৈরি হয় তাতে এমিটর থেকে বেসে পৌছনো ইলেকট্রনগুলো দ্রুত বেস থেকে কালেক্টরে চলে যায় এবং সেখান থেকে কালেক্টরের সঙ্গে যুক্ত তড়িৎ-দ্বারের মাধ্যমে ব্যাটারিতে পৌছে যায়। এই তড়িৎ প্রবাহকে বলা হয় কালেক্টর কারেন্ট I_{C}। এমিটর থেকে যতগুলো ইলেকট্রন বেসে যায় তার সবগুলো কিন্তু কালেক্টরে পৌছাতে পারেনা। কারণ কিছু ইলেকট্রন p-টাইপ বেসে অবস্থিত হোলের সাথে পুনর্মিলিত (recombine) হয়। বেসে এই ইলেকট্রন ও হোলের পুনর্মিলন রোধ করবার জন্যই ওর বেধ বা প্রস্থ এবং p-টাইপ ডোপিংয়ের মাত্রা খুবই কম রাখা হয় (যাতে সেখানে খুব কম পরিমানে হোল থাকে)। এর ফলে যতগুলো ইলেকট্রন এমিটর থেকে বেসে পৌছয় তার বেশিরভাগই কালেক্টরে চলে যেতে পারে [বেধ সরু করলে ইলেকট্রনগুলি দ্রুত বেসের সেই বেধ পার হয়ে যেতে পারবে। আর কম ডোপিং করলে বেসে খুব কম সংখ্যক হোল থাকবে পুনর্মিলনের জন্য। ]। অর্থাৎ কালেক্টর কারেন্ট ও এমিটর কারেন্ট প্রায় সমান (I_C approx I_E)। এইখানে কিন্তু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মজাদার ব্যাপার ঘটে। এমিটর-বেস জংশনে যেহেতু সম্মুখী বায়াস দেওয়া থাকে তাই ওর রোধ (resistance) অত্যন্ত কম। অপরপক্ষে কালেক্টর-বেস জংশনে বিমুখী বা রিভার্স বায়াস থাকার দরুন ওর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত কারেন্টের মান কালেক্টর-বেস জংশনের ভোল্টেজের উপর নির্ভর করেনা (রিভার্স ডায়োডের I-V বৈশিষ্ট মনে কর)। সুতরাং কালেক্টর ও বেসের মাঝে অপর কোন অতিরিক্ত রোধ (load resistance) লাগালেও ওই বর্তনীতে (circuit) কারেন্টের মানের কোন পরিবর্তন হবেনা (লোডে ভোল্টেজ ড্রপের ফলে কালেক্টর-বেস জংশনের রিভার্স বায়াস কম হলেও তাতে কালেক্টর কারেন্ট একই থাকবে)। তাই ট্রানজিস্টার একটি আদর্শ কারেন্ট সোর্স (current source) রূপে কাজ করতে পারে। যদি কালেক্টর-বেস বর্তনীতে একটি উচ্চ মানের লোড রোধ (load resistance) লাগানো হয় তবে তার মধ্যে দিয়েও I_C approx I_E কারেন্ট প্রবাহিত হবে (যতক্ষণ এমিটর-বেস ও কালেক্টর-বেস জংশন যথাক্রমে সম্মুখী ও বিমুখী বায়াস আছে)। সুতরাং ট্রানজিস্টার ব্যবহার করে একটি স্বল্প রোধ যুক্ত বর্তনী (এমিটর-বেস) থেকে মানের প্রায় কোন পরিবর্তন না ঘটিয়ে তড়িৎ প্রবাহ বা কারেন্ট একটি উচ্চ রোধ যুক্ত বর্তনীতে (কালেক্টর-বেস) প্রেরণ করা সম্ভব। ফলে ভোল্টেজ গেইন পাওয়া যেতে পারে। ১ নম্বর ছবিতে,

\displaystyle I_E approx \frac{V_{in}}{R_E}

\displaystyle V_{out} = I_C R_C approx I_E R_C approx \frac{R_C}{R_E} V_{in}

সুতরাং ভোল্টেজ গেইন A_v

\displaystyle A_v = \frac{V_{out}}{V_{in}} approx \frac{R_C}{R_E}

যেহেতু R_C > R_E রাখা যেতেই পারে, তাই A_v > 1

এবারে আমরা দেখব কিভাবে ট্রানজিস্টারে কারেন্ট গেইন পাওয়া যায় এবং কিভাবে ট্রানজিস্টার পরিবর্ধক বা amplifier রূপে কাজ করে। সেজন্য বেসের সঙ্গে যুক্ত তড়িৎ-দ্বারের মধ্যে দিয়ে যে তড়িৎ প্রবাহ হয় (বেস কারেন্ট I_B) তার প্রকৃতি আমাদের জানতে হবে। বেস কারেন্টের মুখ্যত দুটি অংশ থাকে। একটির সাথে তোমরা আগেই পরিচিত হয়েছো। সেটা হল বেস থেকে এমিটরে হোলের প্রবাহের দরুন সৃষ্ট কারেন্ট (I_{Ep})। বেস কারেন্টের অপর উপাদান বেসের মধ্যে ইলেকট্রন ও হোলের পুনর্মিলনের ফলে সৃষ্ট তড়িৎ প্রবাহ। যেহেতু কিছু সংখ্যক হোল বেসের মধ্যে ইলেকট্রনের সাথে পুনর্মিলিত হয়, তাই ব্যাটারি থেকে সেই সংখ্যক হোল আবার বেসের মধ্যে সরবরাহ করতেই হবে। এই হোল সরবরাহের ফলে যে কারেন্ট তৈরি হয় তাকে বলা হয় পুনর্মিলন প্রবাহ বা recombination current (I_R)। সুতরাং,

\displaystyle I_B = I_{Ep} + I_R…………………(2)

এবারে দেখতে হবে এমিটর কারেন্টের কতটা অংশ কালেক্টরে পৌছয়। আগেই বলেছি যে এমিটর থেকে বেসে পৌছানো ইলেকট্রনগুলোই শুধু কালেক্টরে গিয়ে কালেক্টর কারেন্ট গঠন করতে পারে। কিন্তু বেসের মধ্যে যেহেতু কিছু সংখ্যক ইলেকট্রন হোলের সাথে পুনর্মিলিত হয় (পূনর্মিলন প্রবাহ I_R) তাই,

\displaystyle I_C = I_{En} - I_R………………….. (3)

(2) ও (3) নম্বর সমীকরণকে পরষ্পরের সাথে যোগ করে,

\displaystyle I_C + I_B =I_{En}+I_{Ep}= I_E implies \frac{I_B}{I_C} = \frac{I_E}{I_C}-1 = \frac{1}{\alpha} -1  text{, with}  \alpha = \frac{I_C}{I_E}……………… (4)

বা, \displaystyle \frac{I_C}{I_B} = \frac{\alpha}{1-\alpha}= \beta …………….. (5)

আমাদের আগের অনুচ্ছেদের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে \alpha < 1, সুতরা \beta >> 1\beta -কে বলা হয় বেস থেকে কালেক্টরে কারেন্ট গেইন বা কারেন্ট এমপ্লিফিকেশন ফ্যাক্টর (current amplification factor)। সুতরাং কালেক্টর কারেন্ট বেস কারেন্টের থেকে অনেক গুণ বেশি। সেজন্য বেস কারেন্ট পরিবর্তন করলে যদি কালেক্টর কারেন্টেরও পরিবর্তন হয় তবে আমরা ট্রানজিস্টারকে এমপ্লিফায়ার বা পরিবর্দ্ধক হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। পরবর্তি অনুচ্ছেদে আমরা সেটাই দেখাবো।

সাম্যাবস্থায় ট্রানজিস্টারের প্রতিটি অংশে মোট চার্জ বা আধান শূন্য হতে হবে। ট্রানজিস্টার যখন কাজ করে তখন এমিটর থেকে ঋণাত্মক আধান বিশিষ্ট ইলেকট্রনগুলি বেসের মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে অতিরিক্ত ঋণাত্মক চার্জ দেয়। এই অতিরিক্ত ঋণাত্মক আধানকে প্রশমিত করার জন্য ব্যাটারি থেকে অবশ্যই কিছু হোলকে বেসে প্রবেশ করতে হবে (ইলেকট্রনের সাথে পুনর্মিলনের জন্য)। যদি বেসের মধ্যে ইলেকট্রনের গড় আয়ু বা লাইফ টাইম tau_n হয় ও বেসের প্রস্থ বা বেধ পার হতে প্রত্যেকটি ইলেকট্রনের গড়ে tau_i সময় লাগে [বেসের বেধ এতটাই সরু করা হয় যে tau_i << tau_n], তবে ব্যাটারি থেকে ইলেক্ট্রন প্রশমনের জন্য আগত অতিরিক্ত হোলকেও বেসের মধ্যে tau_n সময় অপেক্ষা করতে হবে ইলেকট্রনের সাথে পুনর্মিলনের জন্য। এই tau_n সময়ে tau_n/tau_i সংখ্যক ইলেকট্রন বেসের মধ্যে দিয়ে এমিটর থেকে কালেক্টরে পার হয়ে যেতে পারে। সুতরাং কার্যকারীভাবে এক একটি হোল , tau_n/tau_i সংখ্যক ইলেকট্রনকে প্রশমিত করতে সক্ষম। আগেই বলেছি ইলেকট্রন-হোল পুনর্মিলনের ফলে যে কারেন্ট তৈরি হয় তা I_R। সুতরাং কালেক্টর কারেন্ট হবে I_C=I_R tau_n/tau_i। যদি ধরে নেওয়া যায় যে I_{Ep} approx 0, তবে (2) নং সমীকরণ থেকে I_B approx I_R এবং,

\displaystyle \frac{I_C}{I_B}=\beta=\frac{tau_n}{tau_i}………….. (6)

যদি বেস কারেন্ট I_B কে প্রবাহিত হতে বাধা দেওয়া হয় তবে বেসের মধ্যে অতিরিক্ত ইলেকট্রন সঞ্চয়ের দরুন যে অতিরিক্ত বিভব তৈরি হবে তা এমিটর থেক বেসে ইলেকট্রনেরর প্রবাহতে বাধার সৃষ্টি করে কালেক্টর কারেন্ট কমিয়ে দেবে। অর্থাৎ বেস কারেন্ট কমালে কালেক্টর কারেন্ট কমে যাবে এবং বেস কারেন্ট বাড়ালে কালেক্টর কারেন্ট বেড়ে যাবে। সুতরাং বেস কারেন্টের মাধ্যমে কালেক্টর কারেন্টকে নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব। এই জন্যই বলা হয়ে থকে যে p-n-p বা n-p-n ট্রানজিস্টার হল কারেন্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (current controlled device)। যদি বেসে একটি AC সিগন্যাল বা কারেন্ট পাঠানো যায় তবে সেই কারেন্টের মানের উপর নির্ভর করে কালেক্টর কারেন্টও পরিবর্তিত হবে। আর যেহেতু কালেক্টর কারেন্টের মান কারেন্ট গেইনের সৌজন্যে বেস কারেন্টের থেকে \beta গুণ বেশি [(5) নং সমীকরণ], তাই কালেক্টর কারেন্টের পরিবর্তনও বেস কারেন্টের থেকে পরিবর্তনের \beta গুণ বেশি হবে। এটাই সিগন্যাল পরিবর্ধন (signal amplification)।

\displaystyle \Delta I_C = \beta \Delta I_B……………… (7)

n-p-n ট্রানজিস্টার সম্মন্ধে আরও তথ্য তোমরা এই সংক্রান্ত wikipedia পৃষ্ঠা থেকে পেতে পার। তবে বিশদে জানতে হলে তোমাদের অবশ্যই পড়তে হবে ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত B. G. Streetman অথবা S. M Sze এর লেখা বই । নিচে এই বইগুলি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় লিঙ্ক দিয়ে দিলাম।

One thought on “n-p-n ট্রানজিস্টার – গঠন ও কার্যপ্রণালী (প্রশ্নোত্তর)”

Leave a Reply

Your email address will not be published.