এতদিনে আমরা তরঙ্গ-কণা দ্বৈত, আনসার্টেনটি নীতি, ওয়েভ ফাংশন, অপারেটর ও তাদের এক্সপেকটেশন ভ্যালূ – কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই বনিয়াদি ব্যাপারগুলি সম্মন্ধে জেনেছি। আজ আমরা আরো একটু এগিয়ে যাবো। তোমরা দেখেছো যে কোন কোয়ান্টাম সিষ্টেমের সমস্ত তথ্য ওই সিষ্টেমের ওয়েভ ফাংশনের মধ্যেই ভরা থাকে; ওয়েভ ফাংশনটিকে খু৺জে পেলেই ওই সিষ্টেম সম্মন্ধে যা কিছু জানা সম্বভ তার সবটাই জানা যায়। ওয়েভ ফাংশন গণনা করার উপায় প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রীয়ান পদার্থবিদ এরউইন রূডল্ফ যোসেফ আলেক্সান্ডার শ্রোডিঙ্গার (Erwin Rudolf Josef Alexander Schrodinger)। এই মহান বিজ্ঞানীর নাম বাংলাতে লেখাটা একটু খটমটে বিষয়। অনেকে লেখেন “এরভিন শ্রোডিঙার”, কেউ কেউ আবার বলেন “শ্রয়ডিঙ্গার”, “শ্রডিঙ্গার” ইত্যাদি। তো আমরা সেসব বিতর্কে না গিয়ে সহজভাবে শুধু লিখব “শ্রোডিঙ্গার”। তবে নাম লেখা নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, একটি বিষয় একেবারে নিশ্চিত যে শ্রোডিঙ্গারের এই আবিষ্কার, যা কিনা “শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ (Schrodinger’s equation)” নামে জগদ্বিখ্যাত, প্রকৃতিকে জানার চেষ্টায় মানুষের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।
সৃষ্টি সম্মন্ধে জানার আগে স্রষ্টার ব্যাপারে আমরা একটু জেনে নেব। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক হিসেবে পরিচিত শ্রোডিঙ্গার অল্প বয়সে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক বিষয় যেমন তেজস্ক্রিয়তা, তড়িৎবিদ্যা, আলো, ব্রাউনিয়ান গতি ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি চার বছর অফিসার হিসাবে যুদ্ধের কাজেও অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৬ সালে পরপর চারটি বিখ্যাত পেপারে শ্রোডিঙ্গার দেখিয়েছিলেন কিভাবে বিভিন্ন সিষ্টেমের ওয়েভ ফাংশন নির্ণয় করা যায়। তিনি তার নিজের তৈরী সমীকরণ ব্যবহার করে সফলভাবে হাইড্রোজেন পরমাণুর বর্ণালীর ব্যাখ্যা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি এটাও দেখিয়েছিলেন কিভাবে কোন সিষ্টেমের ওয়েভ ফাংশন সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। এই পেপারগুলিই শ্রোডিঙ্গারের জীবনের সর্ব্বশ্রেষ্ট আবিষ্কার যার জন্য ১৯৩৩ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করা হয়। শ্রোডিঙ্গার তার সারাজীবন বেদান্ত দর্শণ সম্মন্ধে আগ্রহী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আমদের একক চৈতন্য (individual consciousness) বিশ্বব্যাপি ব্যাপৃত চৈতন্যের (universal consciousness) প্রকাশমাত্র। যাই হোক, অনেক কথা হল, এবারে কাজ শুরু করা যাক।
[বিঃ দ্রঃ – যারা ক্যালকুলাস জাননা তারা নিচে দেওয়া ডেরীভেশন বাদ দিয়ে সোজা শেষ অনুচ্ছেদে চলে যেতে পার।]
ধর কোন সিষ্টেমের ওয়েভ ফাংশনকে একটি প্লেন ওয়েভ (প্লেন ওয়েভ সম্মন্ধে জানতে প্রবন্ধের শেষে দেওয়া নোট দেখ) দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে,
, যেখানে
ও
হল যথাক্রমে কণাটির ভরবেগ ও শক্তি।
নর্মালাইজেশন কনস্ট্যান্ট,
,
হল প্লাংক ধ্রুবক এবং
।
ও
যথাক্রমে অবস্থান ও সময় সংক্রান্ত চলরাশি। তোমরা জানো যে
,
হল গতিশক্তি ও V স্থিতিশক্তি। যেহেতু
ভরবিশিষ্ট কণার ক্ষেত্রে,
, অতএব আমরা লিখতে পারি,
সমান চিহ্নের দুদিকে দিয়ে গুণ করে পাওয়া যায়,
———— (1)
এখন দেখ, যদি আমরা কে
-এর সাপেক্ষে একবার differentiate করি তবে,
সুতরাং, ————- (2)
কে বলা হয় শক্তির অপারেটর।
এবারে যদি আমরা কে
এর সাপেক্ষে দুবার differentiate করি, তবে,
অতএব, ————— (3)
সমীকরণ নং (2) এবং (3) ব্যবহার করে আমরা (1) নং সমীকরণকে নিম্নলিখিতভাবে লিখতে পারি,
বা ————- (4),
যেখানে কে বলা হয় হ্যামিল্টোনিয়ান (Hamiltonian) অপারেটর যা মূলত স্থিতিশক্তি ও গতিশক্তির অপারেটরের যোগের ফলে সৃষ্ট অপারেটর।
(4) নং সমীকরণটিই হল সময় নির্ভর (time dependent) একমাত্রিক (one dimensional) শ্রোডিঙ্গারের ইক্যুয়েশন। এই সমীকরণ ব্যবহার করে শুধু যে ওয়েভ ফাংশন নির্ণয় করা যায় তাই নয়, ওয়েভ ফাংশন কিভাবে সময়ের সাথে পরিবর্তিত (dynamics of the wave function) হয় তাও জানা যায়। এখানে এটা বলে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি স্বীকার্য শর্ত (postulate); এই সমীকরণকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মৌলিক নীতি থেকে আহরণ (derivation) করা যায়না। উপরে দেওয়া ক্যালকুলেশন শুধুমাত্র এটা বুঝতে সাহায্য করে যে ওয়েভ ফাংশন যে সমীকরণ মেনে চলবে সেটা দেখতে কেমন হওয়া প্রয়োজন। এই ক্যালকুলেশন কোনভাবেই শ্রোডিঙ্গারের ইক্যুয়েশনের derivation নয়। এটা শুনে তোমাদের মনে হতে পারে যে যদি শ্রোডিঙ্গারের ইক্যুয়েশন derive করা নাই যায় তাহলে এটার কি নিশ্চয়তা যে ওই সমীকরণটিতে কোন ভূল নেই? এর উত্তর – বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষাগারে করা পরীক্ষা এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে যে আলোর থেকে অনেক কম বেগে চলা কোয়ান্টাম কণাদের, অর্থাৎ non-relativistic কণাদের জন্য শ্রোডিঙ্গারের ইক্যুয়েশন একদম সঠিক। যদি কণার বেগ আলোর বেগের তুলনীয় হয় তবে তার জন্য প্রয়োজন ডিরাকের সমীকরণ। ত্রিমাত্রায় (in 3 dimension) সময় নির্ভর শ্রোডিঙ্গার ইক্যুয়েশন হল,
আজ এপর্যন্তই রইল, ভালো থেকো ও পড়তে থাকো।
নোটঃ
প্লেন ওয়েভঃ এটা এক ধরনের নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক বিশিষ্ট তরঙ্গ যার ওয়েভ-ফ্রন্টগুলি (সম-দশা যুক্ত তল) হল পরষ্পরের সাথে সমান্তরাল সমতল। এক মাত্রায় (in one dimension) প্লেন ওয়েভে নিম্নলিখিত ফাংশন দিয়ে প্রকাশ করা হয়ঃ
, যেখানে
ও
হল যথাক্রমে ওয়েভ নাম্বার (
,
হল তরঙ্গদৈর্ঘ) এবং কৌণিক কম্পাঙ্ক (=
কম্পাঙ্ক)।
যেহেতু তরঙ্গের কোয়ান্টার জন্যে (দ্য ব্রোয়ির থিয়োরী) এবং
(প্লাংকের সূত্র), সুতরাং,
লক্ষ্য কর যে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ কেমন হতে পারে সেটা আহরণ বা derive করতে গিয়ে আমরা শক্তিকে দুরকমভাবে লিখেছি; একবার লিখেছি , যা কিনা কণা বৈশিষ্টের প্রতিফলন। আবার ওয়েভ ফাংশন লিখতে গিয়ে আমরা ব্যবহার করেছি
, যা তরঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ পদার্থের কণা ও তরঙ্গ বৈশিষ্টকে একসাথে মিলিয়ে দিলে তবেই আমরা সঠিক অনুমান করতে পারি ওয়েভ ফাংশন কেমন সমীকরণ মেনে চলবে। আরেকটি কথা এখানে বলে রাখা দরকার; আমরা উপরের গণনাটি করতে প্লেন ওয়েভ ব্যবহার করেছি, কারণ প্লেন ওয়েভ ব্যবহার করে যেকোন ধরনের ওয়েভ তৈরী করা যায় (মনে আছে তরঙ্গের উপরিপাত)। সুতরাং ওই ডেরিভেশনটি যেকোন ধরনের ওয়েভ ফাংশন ব্যবহার করেই করা সম্ভব, শুধু ক্যালকুলেশন একটু কঠিন হয়ে যাবে মাত্র।