কোয়ান্টাম অপারেটর, সহজ করে

আজকের বিষয়বস্তু খুব ছোট্ট। এদ্দিনে তোমরা “অপারেটর” – এই শব্দটা অনেকবার শুনেছো; অনেকে হয়তো ওটার মানে খুব ভালো করে বুঝেও গেছো। আমাদের আজকের আলোচনা শুধু সেইসব বন্ধুদের জন্য যাদের এখনো পর্যন্ত শব্দটা শুনলে মাথায় ঠিক “ঘন্টা” বাজেনা। বন্ধুগণ, চিন্তার কোনো কারণ নেই! কথায় আছেনা – “একবারে না পারিলে কর শতবার”। তাই আমি চেষ্টা করব আরো একটু সহজ করে এই অপারেটর শব্দটা তোমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করানোর। আশাকরি তোমাদের মাথার খূলি আমার মত এত মোটা নয় যে আঠারোবার চেষ্টা করে তারপর সফল হতে হবে! আমার বিশ্বাস তোমরা একবারেই শিখে যাবে।

ডেভীড জে. গ্রিফীথ তার লেখা কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইতে প্রথম অধ্যায়ের 29 নম্বর পৃষ্ঠায় একটি ফুটনোটে খুব সুন্দরভাবে ও সহজে ব্যাখ্যা করেছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সে “অপারেটরের” শব্দের অর্থ। তার কথা অনুযায়ী “অপারেটর” হল ওই অপারেটরের ঠিক পরেই যে ফাংশন থাকে তার উপর কিছু করার নির্দেশনামা। যেমন কোন ওয়েভ ফাংশনের সামনে অবস্থান অপারেটর বসানোর মানে হল ওই ফাংশনটিকে x (অবস্থানের অপারেটর) দিয়ে গুণ করতে নির্দেশ দেওয়া। তেমনি ভরবেগের অপারেটর (hat{p} = -i\hbar\frac{\partial}{\partial x}) কোন ফাংশনের সামনে থাকার অর্থ ওই ফাংশনটিকে x -এর সাপেক্ষে ডিফারেনশিয়েট করে যে ফল পাওয়া যাবে তাকে -i\hbar দিয়ে গুণ করার নির্দেশনামা। ভরবেগের অপারেটর হল ডিফারেনশিয়াল অপারেটরের একটি উদাহরণ; কেন তা তো দেখতেই পারছো। ডিফারেনশিয়াল অপারেটরের আরও উদাহরণ হল শক্তির অপারেটর (i\hbar\frac{\partial}{\partial t}), গতিশক্তির অপারেটর (-\frac{\hbar^2}{2m}\frac{\partial^2}{\partial x^2})। অবস্থানের অপারেটর হল \multiplicative বা গুণনশীল অপারেটর। যেকোন ধ্রুবক, x^2, i ইত্যাদি হল \multiplicative বা গুণনশীল অপারেটরের আরও উদাহরণ। আমরা কোয়ান্টাম মেকানিক্সে সাধারণত যেসব অপারেটর দেখব তারা হয় ডিফারেনশিয়াল অপারেটর বা \multiplicative অপারেটর বা এদের কোন সমাহার (combination)।

চল তোমাদের ছোট্ট একটি গল্প বলি। একবার এক বিশ্রী মহাজাগতিক ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপ পৃথিবীতে যত গণিতজ্ঞ ছিলেন সব্বাই একাসাথে উন্মাদ হয়ে গেলেন। অবশ্য কথাটা যে আমি পুরোপুরি ঠিক বললাম তা নয়, কারণ গণিতজ্ঞরা এমনিতেই আ৺ধপাগলা থাকেন। তো ধরে নাও আ৺ধপাগলা থেকে সবাই বদ্ধ উন্মাদ হয়ছেন। তখন সেইসব গণিতজ্ঞদের বৌয়েরা সকলে মিলে বুদ্ধি করে এক পাগলা গারদে সবাইকে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু সমস্যাটা হল যে পাগল হলে কি হবে, ওনারা তো সকলেই গণিত বিশারদ, অংকটা ভোলেন কি করে। ওই গণিতজ্ঞদের মধ্যে সবথেকে ভয়ঙ্কর ছিলেন মহাপণ্ডিত ল্যাগরেঞ্জ (Lagrange)। উনি সুস্থ থাকা অবস্থাতেই পৃথিবীর বাকিসব ম্যাথেমেটিশিয়ান’রা ওনার সামনে সেমিনার দিতে গিয়ে ভিরমী খেতেন, আর এখন পাগলা গারদে তো তিনি রীতিমত বিভীষিকা। ল্যাগরেঞ্জ যাকে সামনে দেখেন তাকেই বলেন “আমি তোমাকে ডিফারেনশিয়েট করলুম”। গণিতজ্ঞদের কাছে এটা একটা মারাত্মক ব্যাপার। ডিফারেনশিয়েট করা মানে তো পুরো পরিবর্তন করা, রুমালকে বেড়াল বানিয়ে দেওয়া। তাই ল্যাগরেঞ্জের শ্রীমুখ থেকে কথাটা শোনামাত্রই ওই সাধারণ গণিতজ্ঞেরা মূর্চ্ছা যেতেন। আর এটা দেখে ল্যাগরেঞ্জের সেকি অট্টহাস্য, রাবণকেও হার মানিয়ে দিতে পারতেন। তো এইরকমই চলছিল, হঠাৎ একদিন সেই পাগলা গারদে এক নতুন রুগী এলেন। বেশ শান্তশিষ্ট ওই রুগীর নাম হ্যামিল্টন। তো একদিন হ্যামিল্টন ল্যাগরেঞ্জের সামনে পড়ে যেতে হ্যামিল্টনকে নতুন মুরগি ভেবে তৎক্ষণাৎ বলে ফেললেন “আমি তোমাকে ডিফারেনশিয়েট করলুম”। নতুন রুগীর কোন ভাবান্তর হলনা। তাই দেখে ল্যাগরেঞ্জ রীতিমত ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার করে বললেন “আমি তোমাকে ডিফারেনশিয়েট করছি”। তবুও হ্যামিল্টন মূর্চ্ছা গেলেন না, ভয়ও পেলেন না; শুধু আস্তে করে কোন ভাবান্তর ছাড়াই জবাব দিলেন “আমি ই টু দি পাওয়ার এক্স (e^x), ডিফারেনশিয়েট করলেও আমার কোনো পরিবর্তন হয়না”। (এই গল্পটি প্রচলিত কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত। কোনো জীবিত বা মৃত ব্যাক্তির নাম বা  কোনো বাস্তব ঘটনার সাথে গল্পটির সাদৃশ্য কাকতালীয় মাত্র।) সুতরাং, দেখলে তো জ্ঞান আমাদেরকে মহাসংকট থেকে উদ্ধার করতে পারে, তাই সবসময় জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করা উচিত (একটু জ্ঞান দিলাম)!

একটা ছোট্ট প্রশ্ন করছি, বলতো রুমালকে বেড়ালে পরিবর্তন করতে কোন অপারেটর লাগে? খুব সহজ উত্তর, লেখকের কল্পনা! এই কল্পনা জিনিসটা শুধু সাহিত্যেই নয়, বিজ্ঞানেও অত্যন্ত প্রয়োজন। কল্পনা করতে পেরেছিলেন বলেই আইনষ্টাইন মহান বিজ্ঞানী। সুতরাং তোমাদেরও কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পাক ও তোমরা ক্লাসে বসে দিবাস্বপ্ন দেখ এই আশা নিয়েই আজকের প্রবন্ধ শেষ করছি। ভালো লাগলে মন্তব্য করতে ভূলোনা।

2 thoughts on “কোয়ান্টাম অপারেটর, সহজ করে”

Leave a Reply

Your email address will not be published.