“রোজ মাছ-ভাত খেতে থাকলে মাঝে একদিন ডাল-ভাতও অমৃত মনে হয়”- কথাটি বলতেন আমাদের স্কুলের বাংলা স্যার। বাক্যটি যে ধ্রুব সত্য তা তোমরা সকলেই জানো। কিন্তু সেটা বিস্মৃত হয়ে এতদিন ধরে আমি শুধু কোয়ান্টাম মেকানিক্সই বকে যাচ্ছিলাম। একটুও খেয়াল ছিলনা যে ব্যাপারটা মারাত্মক শক্তিশালী ঘুমপাড়ানির ওষুধে পরিণত হতে পারে। শেষটায় এক সহৃদয় পাঠকের খোঁচা খেয়ে ঘুম ভাঙল। তাই আজ থেকে আমরা আধুনিক পদার্থবিদ্যার অন্য আরেকটি প্রধান স্তম্ভ, আপেক্ষিকতা নিয়ে আলোচনা শুরু করব। সঙ্গে অবশ্যই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোচনাও চলতে থাকবে। আজকের এই প্রথম পোস্টে আমরা জানবো আপেক্ষিকতা ব্যাপারটি আসলে কি? নিউটনের সময়কার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে কিভাবে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের জন্ম হল সে ইতিহাসও আজকের এই প্রাথমিক আলোচনায় উঠে আসবে। সুতরাং চল আর কালক্ষেপ না করে চটপট তোমাদের নিয়ে যাই স্থান ও কালের দাম্পত্য সম্পর্কের রহস্যময় জটিলতায়।
আজ হতে তিনশত সাতাশ বছর পূর্বে স্যার আইজ্যাক নিউটন তার তিনটি গতিসূত্র আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজ জগৎ বিখ্যাত। হাইস্কুলের গন্ডি পার হয়েছে এমন প্রত্যেকেই সে সূত্রগুলি এখনই ঝটপট বলে দিতে পারবে। আর এটাও সকলেরই জানা যে বস্তুর অবস্থান ও গতিবেগ সবসময়ই কোন কিছুর সাপেক্ষে মাপা হয়। কোন বস্তুর অবস্থান “অমুক” ও গতিবেগ “তমুক” কথাটি অর্থহীন যতক্ষন না এটা বলা হচ্ছে কিসের সাপেক্ষে ওগুলো মাপা হয়েছে। যার সাপেক্ষে এই অবস্থান ও গতিবেগ মাপা হয় তাকেই বলা হয় রেফারেন্স ফ্রেম (frame of reference)। নিউটন তার প্রথম গতিসূত্রের মাধ্যমে এক বিশেষ ধরনের রেফারেন্স ফ্রেমের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন যে ফ্রেমে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির ও গতিশীল বস্তু সর্বদা সমবেগে সরলরেখায় গতিশীল থাকে, যতক্ষন না বাইরে থেকে ওই বস্তুর উপর কোন অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই ধরনের ফ্রেম’কে বলা হয় ইনার্শিয়াল রেফারেন্স ফ্রেম (inertial reference frame)। নিউটনের বাকি সূত্রগুলো শুধু এই ইনার্শিয়াল রেফারেন্স ফ্রেমেই প্রযোজ্য। [“ইনার্শিয়াল রেফারেন্স ফ্রেম” শব্দটিকে বাংলায় কি করে লিখব সেটা বুঝে উঠতে না পেরে ওটাকে ইংরেজিতেই রেখে দিলাম। উইকিপিডিয়াতে ওর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে লেখা রয়েছে “জড় প্রসঙ্গ কাঠামো”, যা শুনতে একটু অদ্ভুত লাগল। আর তাছাড়া “জড় প্রসঙ্গ কাঠামো” কথাটির মানে বোঝা বাংলায় বিশারদ ব্যাক্তির পক্ষেও “ইনার্শিয়াল রেফারেন্স ফ্রেম” শব্দটির অর্থ বোঝার থেকে সহজতর বলে মনে হয়না। সমস্ত নামবাচক বিশেষ্যের আক্ষরিক অনুবাদ অপ্রয়োজনীয়, বিশেষত যখন অনুবাদের ফলে বুঝতে আমদের কোন অতিরিক্ত সুবিধা হয়না।] যেহেতু ইনার্শিয়াল ফ্রেমে অবস্থিত বস্তুর উপর বাইরে থেকে কোন বল প্রয়োগ না করলে বস্তুর গতির অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়না, তাই এই ফ্রেমগুলোকেও অবশ্যই হয় স্থির নতুবা সরলরেখায় সমবেগে গতিশীল থাকতে হবে। নাহলে বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করলেও ফ্রেমের ত্বরণ কিংবা মন্দনের দরুন উদ্ভুত ছদ্ম বলের (pseudo force) প্রভাবে ওই ফ্রেমে অবস্থিত বস্তুর গতিবেগের পরিবর্তন হবে। কিন্তু গোলমেলে প্রশ্ন হচ্ছে কিসের সাপেক্ষে এই ইনার্শিয়াল ফ্রেমগুলো স্থির বা সমবেগে সরলরেখায় গতিশীল? নিউটন ধরে নিয়েছিলেন যে অন্ততপক্ষে একটি এমন কোন পরম ফ্রেম (absolute space) আছে যার সময়ের সাথে কোন রকম পরিবর্তন হয়না। এই পরম ফ্রেমের সাপেক্ষে স্থির বা সমবেগে গতিশীল ফ্রেমই ইনার্শিয়াল ফ্রেম।

নিউটন মহাকর্ষ বলের সূত্রও আবিষ্কার করেছিলেন। মনে কর দুটি বস্তু এই মহাকর্ষ বলের প্রভাবে পরষ্পরকে আকর্ষণ করছে। মহাকর্ষ বলের সূত্র ও নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র ব্যবহার করে ওই বস্তু দুটির গতির সমীকরণ সহজেই লিখে ফেলা যায়। তবে তার আগে আমাদের কোন একটি ইনার্শিয়াল ফ্রেম পছন্দ করতে হবে। ওপরের ছবিতে দেখানো হল এরকম একটি ফ্রেম যেখানে
ও
যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় বস্তুর অবস্থান ও
সময় প্রকাশ করে। তবে,
(1a)
(1b)
হল সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক। এবারে মনে কর
হল আরেকটি ইনার্শিয়াল ফ্রেম যা
এর সাপেক্ষে
বেগে
অক্ষ বরাবর ধাবমান। যদি
ফ্রেমে আগের বস্তু দুটির অবস্থান যথাক্রমে
ও
ও সময়
হয় তবে স্পষ্টতই,
(2a)
(2b)
এই সমীকরণকে বলা হয় গ্যালেলিয়ান ট্রান্সফর্মেশন বা রূপান্তরণ। যদি (2) নং সমীকরণ থেকে বস্তুদুটির এই রূপান্তরিত স্থানাঙ্ক (1) নম্বর সমীকরণে বসানো হয় তবে স্পষ্টতই,
(3a)
(3b)
সুতরাং গ্যালেলিয়ান রূপান্তরণের মাধ্যমে এক ইনার্শিয়াল ফ্রেম থেকে অপর ইনার্শিয়াল ফ্রেমে গেলেও নিউটনের সুত্রগুলি দেখতে একই রকম থাকে। এই ঘটনাকেই বলা হয় আপেক্ষিকতা (বা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা)। অর্থাৎ গ্যালেলিয়ান রূপান্তরণের ফলে পদার্থবিদ্যার মূল সূত্রগুলির রূপের কোন পরিবর্তন হয়না। আরও মার্জিত করে লিখলে – গ্যালেলিয়ান রূপান্তরণের মাধ্যমে সম্পর্কযুক্ত সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমেই পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অভিন্ন। গ্যালেলিয়ান আপেক্ষিকতা ও নিউটনের সূত্রগুলি বেশ চলছিল। পরীক্ষাগারের ক্ষূদ্রবস্তু থেকে শুরু করে সৌরজগতের বিশালাকায় গ্রহ ইত্যাদির গতি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এই নিয়মাবলী অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছিল। এই সাফল্য তখনকার নিরিখে এতটাই বেশি ছিল যে ওই সময়কার বিজ্ঞানীদের ধারনা জন্মেছিল পদার্থবিদ্যায় যা কিছু আবিষ্কার হবার তার সবটাই হয়ে গেছে। আর এই মনোভাব দেখে প্রকৃতি নিশ্চয়ই সবার অলক্ষে বসে হেসেছিলেন।
গোল বাধালেন মাইকেল ফ্যারাডে। [বিঃদ্রঃ-বিজ্ঞানচর্চার পথে কোন কিছুই যে প্রকৃত অন্তরায় নয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন এই মাইকেল ফ্যারাডে।] তিনি পরীক্ষা করে বলে দিলেন যে তড়িৎ ও চুম্বকত্ত্ব পরষ্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর পর এলেন জেম্স ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। তিনি আরও একধাপ এগিয়ে অংক কষে দেখিয়ে দিলেন যে তড়িৎ ও চুম্বকত্ত্ব আসলে একই সত্ত্বার ভিন্ন প্রকাশ মাত্র এবং সেই একক সত্ত্বা হল তড়িৎ-চূম্বকীয় ক্ষেত্র। আধান (charge) ও তড়িৎ প্রবাহ (current) বর্জিত স্থানে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্র সম্মন্ধিয় বিখ্যাত চারটি সমীকরণ হল,
(4)
যেখানে ও
যথাক্রমে ইলেকট্রিক ও ম্যাগনেটিক ফিল্ড।
ও
হল যথাক্রমে শূন্যস্থানের ভেদনযোগ্যতা বা চৌম্বক ধ্রুবক এবং প্রবেশ্যতা বা তড়িৎ ধ্রুবক।
(4) নম্বর সমীকরণ থেকেই দেখা যাচ্ছে যে সময় নির্ভর তড়িৎ ও চৌম্বকীয় ক্ষেত্র পরষ্পরের সাথে জড়িয়ে গেছে – একটিকে অপরটির থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল তড়িৎ ক্ষেত্র যেমন সময় নির্ভর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে, তেমনি সময়ে পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্রও সময় নির্ভর তড়িৎ ক্ষেত্রের সৃষ্টি করে। (4) নম্বর সমীকরণ থেকে,
বা,
বা, (5a)
একইভাবে,
(5b)
(5a) এবং (5b) সমীকরণ হল গতিবেগ যুক্ত চলতরঙ্গের ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ। সুতরাং তড়িৎ ও চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তরঙ্গের আকারে প্রবাহিত হয়, একত্রে যার নাম দেওয়া হয়েছিল তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ।
ও
এর মান বসিয়ে ম্যাক্সওয়েল বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন যে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের গতিবেগ (
) আলোর বেগের সাথে আশ্চর্যরকম ভাবে মিলে যায়। এর থেকে বোঝা গিয়েছিল যে আলো একধরনের তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। আর এখান থেকেই গ্যালেলিয়ান আপেক্ষিকতার ত্রুটি বের হতে শুরু করেছিল। (5) নম্বর সমীকরণে প্রদত্ত তরঙ্গকে গ্যালেলিয়ান রূপান্তরণের মাধ্যমে এক ইনার্শিয়াল ফ্রেম
থেকে অপর একটি ইনার্শিয়াল ফ্রেম
-তে নিয়ে যেতে হলে নিচে প্রদত্ত পদক্ষেপ অনুসারে এগোতে হবে।
সুতরাং,
এই রাশিগুলোকে (5) নম্বর সমীকরণে বসালেই আমরা ইনার্শিয়াল ফ্রেমে তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ পেয়ে যাব।
(6a)
(6b)
সুতরাং গ্যালেলিয়ান রূপান্তরণের মাধ্যমে এক ইনার্শিয়াল ফ্রেম থেকে অন্য ইনার্শিয়াল ফ্রেমে গেলে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণের রূপ পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা গ্যালেলিয়ান আপেক্ষিকতা সূত্রের বিরোধী। উনবিংশ শতাব্দির শেষের দিকের এই আবিষ্কার প্রমাণ করে দিয়েছিল যে কোথাও একটা কিছু গন্ডগোল আছে। অধিকিন্তু, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ থেকে দেখা যায় যে আলোর বেগ একটি ধ্রুবক ()। এবারে যদি কল্পনা করা হয় যে
ফ্রেম বসে রাম
ফ্রেমের দিকে একটি টর্চ জ্বালালো। তবে নিউটনের তত্ত্ব অনুসারে
ফ্রেমে বসে থাকা আব্দুলের সাপেক্ষে আলোর বেগ হওয়া উচিৎ
, যা আর ধ্রুবক রইলো না। অর্থাৎ ম্যাক্সওয়েলর তত্ত্ব গ্যালেলিয়ান আপেক্ষিকতা ও নিউটনের তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই পটভূমিকাতেই লোরেন্ৎস, পোয়াঁকারে ও আইনস্টাইনের হাত ধরে বিশেষ আপেক্ষিকতার জন্ম। এই মনিষীরা গ্যালেলিয়ান রূপান্তরণের রূপ বদলে নতুন এমন একটি স্থানাঙ্ক রূপান্তরণ (transformation) আবিষ্কার করেন যার সাপেক্ষে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমে একই থাকে। এই বিশেষ রূপান্তরণের নাম দেওয়া হয় লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশন বা রূপান্তরণ।
ধরা যাক থেকে
ফ্রেমে নিচে প্রদত্ত এই রূপান্তরণ সমীকরণের সাপেক্ষে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বের কোন পরিবর্তন হয়না।
(7)
তবে,
অতএব ফ্রেমে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ,
এবং
ফ্রেমে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সমীকরণ একই রাখতে গেলে,
(8a)
(8b)
(8c)

যেহেতু ফ্রেম
ইনার্শিয়াল ফ্রেমের সাপেক্ষে
গতিবেগে চলছে, তাই
ফ্রেমের মূলবিন্দু, অর্থাৎ
বিন্দুর জন্য (২ নম্বর ছবিতে দেখ)
। অতএব (7) নম্বর সমীকরণ থেকে,
(8d)
(8) নম্বর সমীকরণ চারটির সমাধান করে সহজেই এই চারটি অজানা রাশির মান নির্ণয় করা যায়।
এবং
সুতরাং,
(9a)
(9b)
(9c)
(9) নম্বর সমীকরণের ট্রান্সফর্মেশন সমীকরণগুলোর সাপেক্ষে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব ও আলোর বেগ সমস্ত ইনার্শিয়াল ফ্রেমেই অপরিবর্তিত থাকে। এই ট্রান্সফর্মেশন বা রূপান্তরণের নাম লোরেন্ৎস ট্রান্সফর্মেশন (Lorentz transformation)। এখান থেকেই বিশেষ আপেক্ষিকতার শুরু যার সম্মন্ধে এর পরের পোস্টে আরও আলোচনা করব।
Osadharon bolleo kom hoy… Notun relativity r serial post hobe jene darunn lagche… Quantum er opr durdanto article gulor moto ei bisoyok post gulo hbe asa kori…. Carry on
অনেক ধন্যবাদ সূজয়।
r ei post er surute apni tana quantum er post er bepare like6en… Sottie ektu ekgheye hole ghumparani motei 6ilo na segulo… R apnar sabolil uposthaponay segulor grohonjoggota are besi hye6e bolei mone kori..
Next Post kobe pabo dada.. Eagerly waiting….
Sujoy, কাল পেয়ে যাবে।
thanks