প্রশ্নোত্তরঃ ল্যাগরেঞ্জিয়ান ও ন্যুনতম অ্যাকশন নীতি

পদার্থবিদ্যায় ল্যাগরেঞ্জিয়ান ও ন্যুনতম অ্যাকশ নীতি (principle of least action) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন সিস্টেম স্থান ও কালে কিভাবে পরিবর্তিত হবে সেটা ন্যুনতম অ্যাকশ নীতি ব্যবহার করে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ক্লাসিক্যাল ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স, ফিল্ড তত্ত্ব ইত্যাদি সর্বত্রই এর বহুল ব্যবহার প্রচলিত। বাঙালীদের কাছে ভাত মাছের যে গুরুত্ব, পদার্থবিদের কাছে ন্যুনতম অ্যাকশ নীতি ও ল্যাজরেঞ্জিয়ান সেই একই গুরুত্বময়। তবে এই দুটো জিনিস স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে ভ্যারিয়েশনাল ক্যালকুলাস নামে গণিতের একটি বিষয় সম্মন্ধে প্রথমে কিছুটা জানতে হবে।

চিত্র ১ - A বিন্দু থেকে B বিন্দুতে পৌছবার যেকোনো দুটি পথ।
চিত্র ১ – A বিন্দু থেকে B বিন্দুতে পৌছবার যেকোনো দুটি পথ।

আমরা একটি একমাত্রিক সিস্টেম ধরে নেব আলোচনার সুবিধের জন্য। মনে কর একমাত্রায় একটি কণা A বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে B বিন্দুতে গেল। অর্থাৎ t_1 সময়ে কণাটি A বিন্দুতে (x_1) ছিল এবং পরে t_2 সময়ে কণাটি B বিন্দুতে (x_2) পৌছায়। A থেকে B তে যাবার সময় যদি কোন মুহূর্ত t তে কণার অবস্থান x=x(t) দিয়ে প্রকাশ করা হয় তবে x(t) হল কণার গতিপথ। প্রশ্ন হল যে কণাটির যাত্রা শুরুর এবং শেষ করার বিন্দু স্থির হলেও ওর যাত্রাপথ কোনটা হবে সেটা কি করে বের করবে? ছবিতে দেখ যে A থেকে B তে পৌছানোর অজস্র পথ বা ট্র্যাজেকটোরি হতে পারে। এর মধ্যে সঠিক রাস্তা খুজতে তো ঠগ বাছতে গা উজার হবার দশা। কিন্তু যেখানে সমস্যা থাকবে, সেখানে অবশ্যই একটা সমাধান ও থাকতেই হবে। সেই সমাধান হল ভ্যারিয়েশনাল ক্যালকুলাস। এবারে সেটাই বলছি। নিচের ইন্টিগ্রালটিকে লক্ষ্য কর,

\displaystyle J = \int_{t_1}^{t_2} f(t,x,dot{x})  dt ……….. (1)

f(t,x,dot{x}) হল t, x=x(t) এবং dot{x} = \frac{dx}{dt} এর একটি ফাংশন (এই ফাংশনটির রূপ কেমন হবে সেটা নিয়ে পরে আলোচনা করছি)। আগেই বলেছি x=x(t) হল t সময়ে কণাটির অবস্থান। স্পষ্টতই সম্ভাব্য বিভিন্ন পথের জন্য x(t) ফাংশনটি আলাদা। এবং এই আলাদা পথগুলির জন্য স্বভাবতই J এর মানও ভিন্ন ভিন্ন হবে। অর্থাৎ J এর মান x(t) এর উপর নির্ভর করে। তার মানে উপরের ইন্টিগ্রালটিতে কোন ফাংশন x(t) ইনপুট হিসেবে ঢোকালে আউটপুট হিসেবে একটি সংখ্যা পাওয়া যাবে। J কে বলা হয় ফাংশনাল, যা একটি ফাংশনকে একটি সংখ্যার সাথে ম্যাপিং করে। [এখানে উল্লেখ্য যে সাধারন ফাংশনে (যেমন x(t)) একটি সংখ্যা ইনপুট করলে অপর একটি সংখ্যা আউটপুট হিসেবে পাওয়া যায়।] ভ্যরিয়েশন ক্যালকুলাসের উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন একটি ফাংশন (বা পথ) x(t) বের করা যার জন্য J এর মান ন্যুনতম হবে। খানিকটা গণিত কষে দেখানো যায় যে যদি x(t) পথের জন্য J এর মান ন্যুনতম হয় তবে,

\displaystyle \frac{\partial f}{\partial x} - \frac{d}{dt}\left(\frac{\partial f}{\partial dot{x}}\right) = 0 …………… (2)

এই সমীকরণের নাম অয়লারের সমীকরণ। চল এই নীতির একটি সহজ উদাহরণ নেওয়া যাক। মনে কর আমাদের উদ্দেশ্য হল দ্বিমাত্রিক X-Y তলে দুটি বিন্দুর মাঝে ন্যুনতম দূরত্ববিশিষ্ট পথ নির্ণয় করা। তোমরা জানো X-Y তলে যদি দুটি খুব কাছাকাছি অবস্থিত বিন্দুর মাঝের দূরত্ব ds হয় তবে,

\displaystyle ds^2 = dx^2 + dy^2 implies ds = dxsqrt{1+\frac{dy}{dx}} ……… (3)

তাহলে মোট দূরত্ব,

\displaystyle S = \int_{x_1}^{x_2} ds = \int_{x_1}^{x_2} sqrt{1+\frac{dy}{dx}}  dx

আমাদের উদ্দেশ্য এমন একটি পথ y(x) বের করা যাতে S এর মান ন্যুনতম হয়। (1) নং সমীকরণের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে,

\displaystyle f = sqrt{1+\frac{dy}{dx}} = sqrt{1+y'}, যেখানে \displaystyle y' = \frac{dy}{dx}

লক্ষ্য কর যে এখানে ইন্ডিপেনডেন্ট রাশি হল x, আর পথ বা ট্রাজেকটোরি হল y = y(x)। অতএব অয়লার সমীকরণ ব্যবহার করে,

\displaystyle \frac{\partial f}{\partial y} - \frac{d}{dx}\left(\frac{\partial f}{\partial y'}\right) = 0

যেহেতু \displaystyle \frac{\partial f}{\partial y} = 0 এবং \displaystyle \frac{\partial f}{\partial y'} = \frac{1}{2}\frac{1}{sqrt{1+y'}}

তাই, \displaystyle 0 - \frac{d}{dx}\left(\frac{1}{2}\frac{1}{sqrt{1+y'}}\right) = 0

বা, \displaystyle \frac{1}{sqrt{1+y'}} = C [C হল ধ্রুবক।]

বা, y' = m implies y = mx + c [m,  c হল ধ্রুবক।]

যা একটি সরলরেখার সমীকরণ। অর্থাৎ সমতলে দুটি বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব ন্যূনতম হবে যদি ওদের সংযোগকারি সরলরেখা বরাবর দূরত্ব পরিমাপ করা হয়। এই উদাহরণ থেকে দেখা গেল কিভাবে ভ্যারিয়েশনাল ক্যালকুলাস ব্যবহার করে দুটো বিন্দুর মধ্যে ইন্টিগ্রাল হিসেবে লেখা কোন ফাংশনালের মান ন্যুনতম করা যায়। স্পষ্টতই f ফাংশনটি কেমন হবে সেটা নির্ভর করে আমরা কি গণনা করতে চাই তার উপর। এবারে আমরা ল্যাগরেঞ্জিয়ান নিয়ে আলোচনা করব।

হ্যামিল্টোনের প্রস্তাবিত ন্যুনতম অ্যাকশন নীতি অনুসারে কোন দুটো সময়ের ব্যবধানে সিস্টেমের গতি এমন হয় যাতে তার অ্যাকশনের মান সবথেকে কম হয়। অ্যাকশন হল উপরে দেখানো ফাংশনালগুলির মত ল্যাগরেঞ্জিয়ানের (L) ইন্টিগ্রাল; অর্থাৎ একমাত্রায় অ্যাকশন (S),

\displaystyle S = \int_{t_1}^{t_2} L (t, x, dot{x})  dt ……………..(4)

সুতরাং উপরে বর্ণিত ভ্যারিয়েশনাল নীতি অনুসারে অ্যাকশন ন্যুনতম হতে হলে,

\displaystyle \frac{\partial L}{\partial x} - \frac{d}{dt}\left(\frac{\partial L}{\partial dot{x}}\right) = 0 …………… (5)

এটাই বিখ্যাত অয়লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণ। এটাকে কোন বস্তু অথবা কোন সিস্টেমের গতির সমীকরণ বের করার একটি বিকল্প পদ্ধতি বলে গন্য করা যেতে পারে, যা নিউটনের সূত্র ব্যবহার করেও নির্ণয় করা যায়। তবে নিউটনের সূত্রের তুলনায় এর অনেকগুলি সুবিধা রয়েছে।

নন-রিলেটিভিস্টিক গতির ক্ষেত্রে কোন সিস্টেমের ল্যাগরেঞ্জিয়ান হল, L = T -V, যেখানে T গতিশক্তি ও V স্থিতিশক্তি। এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, ল্যাগরেঞ্জিয়ান L = T -V কেন লেখা হয়? তার উত্তর এক কথায় বললে দাঁড়ায় যে, এই ল্যাগরেঞ্জিয়ান অয়লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণে ব্যবহার করলে তবেই নিউটনের সূত্রগুলি পাওয়া যায়। সত্যি কথা বলতে গেলে, কোন সিস্টেমের ল্যাগরেঞ্জিয়ান বের করার পদ্ধতি অনেকটাই অনুমান নির্ভর। কি কি বল কাজ করছে সেটা দেখে সেই অনুসারে ল্যাগরেঞ্জিয়ান তৈরি করা হয় যাতে তার থেকে সিস্টেমের গতির সঠিক সূত্রগুলি ফেরত পাওয়া যেতে পারে। যেমন নন-রিলেটিভিস্টিক গতির (যেখানে গতিবেগ আলোর বেগের চেয়ে অনেক কম) ক্ষেত্রে L = T -V ব্যবহার করে যেকোন মেকানিকাল সিস্টেমের গতির সমীকরণ সহজেই বের করা যায়।

এবারে ন্যূনতম অ্যাকশন নীতির প্রয়োগ হিসেবে সরল দোলকের উদাহরণ দেব। মনে কর একটি ভরহীন স্প্রীং -এর মাথায় একটি m ভর লাগানো আছে যা অনুভূমিক ভাবে x অক্ষ বরাবর দুলতে পারে। তবে ওই বস্তুর গতিশক্তি T = \frac{1}{2}m dot{x}^2 এবং স্থিতিশক্তি V = \frac{1}{2}k x^2। অতএব,

\displaystyle L = T -V = \frac{1}{2}\left(mdot{x}^2 - kx^2\right)

\displaystyle \frac{\partial L}{\partial x} = -kx,  \frac{\partial L}{\partial dot{x}} = mdot{x}

তাহলে অয়্লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণ (5) ব্যবহার করে,

\displaystyle -kx - m\frac{ddot{x}}{dt} = 0 implies \frac{d^2x}{dt^2} = -\frac{k}{m}x ……… (6)

তোমাদের নিশ্চয় চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না যে এটাই সরল দোলকের সমীকরণ। আগেই বলেছি, ল্যাগরেঞ্জিয়ান ব্যবহার করে গতির সমীকরণ বের করা অনেক ক্ষেত্রে নিউটনের সূত্র ব্যবহার করে গতির সমীকরণ নির্ণয় করা অপেক্ষা সহজ। এর একটি কারণ হল নিউটনের সূত্র প্রয়োগ করতে হলে সিস্টেমের উপর কি কি বল কাজ করছে সেটা জানতে হয়। বল একটি ভেক্টর রাশি যা নিয়ে অংক করা অপেক্ষাকৃত জটিল। অপরপক্ষে ল্যাগরেঞ্জিয়ানে শুধুমাত্র গতিশক্তি ও স্থিতিশক্তি নিয়ে কারবার করতে হয়, যারা স্কেলার রাশি। অয়্লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণের আরেকটি প্রয়োগ আমরা অলোচনা করেছি গ্রহদের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হয় কেন সেটা দেখানোর জন্য। ওই একই অংক নিউটনের সূত্র ব্যবহার করে সমাধান করতে গেলে অনেকটা বেশি বেগ পেতে হত।

ত্রিমাত্রায় একশন,

\displaystyle S = \int_{t_1}^{t_2} L (t, x, y, z, dot{x}, dot{y}, dot{z})  dt ………… (7)

আর যদি সিস্টেমের “ডিগ্রী অব ফ্রীডম” বহু হয়, তবে,

\displaystyle S = \int_{t_1}^{t_2} L (t, q_1, q_2, q_3,.... dot{q_1}, dot{q_2}, dot{q_2}...)  dt ………………….. (8)

যেখানে q_i দের বলা হয় সিস্টেমের জেনারালাইজড স্থানাঙ্ক এবং dot{q_i} দের বলা হয় জেনারালাইজড গতিবেগ। এই ক্ষেত্রে অয়লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণ হবে,

\displaystyle \frac{\partial L}{\partial q_i} - \frac{d}{dt}\left(\frac{\partial L}{\partial dot{q_i}}\right) = 0,   text{for } i = 1, 2, 3 .... ………………… (9)

অর্থাৎ প্রতিটি ব্যবহৃত জেনারালাইজড স্থানাঙ্কের জন্য একটি করে সমীকরণ থাকবে। এই স্থানাঙ্কগুলিকে এমনভাবে পছন্দ করা হয় যাতে সিস্টেমের গতির সমীকরণ বের করতে সুবিধে হয় এবং ন্যুনতম সংখ্যক অয়লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণ লিখতে হয়। যেমন উপরের সরল দোলকের উদাহরণে জেনারালাইজড স্থানাঙ্ক ছিল x। একইভাবে গ্রহদের গতির আলোচনার জন্য জেনারালাইজড স্থানাঙ্ক ছিল দুটো, r এবং theta। আশা করছি এই পোস্টটি অনেকের উপকারে আসবে। ল্যাগরেঞ্জিয়ান ও তার প্রয়োগ সম্মন্ধে আরো জানতে হলে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের উপর লেখা বই পড়তে হবে। এমন একটি বই হল Goldstein -এর লেখা এই বইটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.