প্রশ্নোত্তরঃ পাঠক বন্ধুর করা বিবিধ প্রশ্নের উত্তর

এই পোস্টে এক পাঠক বন্ধুর করা কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হল। প্রশ্নগুলি বিবিধ বিষয়ের।

১) সীরিজ বর্তনীর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ সমান ও সমান্তরাল বর্তনীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য সমান কেন?

উঃ- যেহেতু তড়িৎ আধান একটি সংরক্ষিত রাশি, অর্থাৎ আধান সৃষ্টি বা ক্ষয় করা সম্ভব নয় তাই বর্তনীর কোন অংশে (যদি বর্তনীতে কেবল রোধ থাকে) যে পরিমান তড়িৎ প্রবাহ বা কারেন্ট ঢুকবে ঠিক সেই পরিমানই বাইরে বেরিয়ে যাবে। কারণ কারেন্ট বা তড়িৎ প্রবাহ মূলত আধানের প্রবাহ ভিন্ন আর কিছুই নয়। ১ নং ছবিতে একটি সীরিজ ও একটি সমান্তরাল বর্তনী দেখানো হয়েছে। দু ক্ষেত্রেই A ও B বিন্দুর মাঝে বিভব পার্থক্য একই। দুটি ক্ষেত্রেই A বিন্দুর মধ্যে দিয়ে যে পরিমান তড়িৎ প্রবাহ ঢুকছে ঠিক সেই পরিমান তড়িৎ প্রবাহ B বিন্দুর মধ্যে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সীরিজ বর্তনীর ক্ষেত্রে যেটা হয় তা হল যে যেহেতু দুটি রোধ পরষ্পরের সাথে সীরিজে যুক্ত তাই তাদের দুজনের মধ্যে দিয়েই তড়িৎ প্রবাহের মাত্রা সমান। ব্যাপারটা সহজে বুঝতে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মনে কর দুটি আলাদা ব্যাসের পাইপকে একটির মাথায় অপরটি সীরিজে জুড়ে দেওয়া হল। এদের মধ্যে একটি খুব সরু ও অপরটি মোটা। এবার যদি তুমি ওই সীরিজে যুক্ত নল দুটির কোন এক মাথায় জল ঢোকাতে থাক তবে সহজেই বুঝতে পারছ যে দুটি নলের মধ্যে দিয়েই জল প্রবাহের হার (আয়তন/সময়) একই হবে। এর কারণ যে পরিমান জল বা কারেন্ট এক প্রান্ত দিয়ে ওই নলদুটির সীরিজ সমন্বয়ে ঢুকবে ঠিক সেই পরিমান জলই অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যাবে, নলের মধ্যে জল সৃষ্টি বা ধ্বংস হতে পারেনা। এটা যদি না বুঝতে পার, তবে একটু ভাব বা সম্ভব হলে পরীক্ষা করে দেখ। তড়িৎ প্রবাহের ক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা ঘটে। যে পরিমান তড়িৎ প্রবাহ সীরিজে যুক্ত একটি রোধের মধ্যে ঢোকে ঠিক একই পরিমান প্রবাহ অপর রোধের মধ্যে দিয়ে বের হবে। তবে উল্লেখ্য যে এখানে কিন্তু প্রতিটি রোধের দুপ্রান্তের বিভব পার্থক্য আলাদা, কারণ বিভব পার্থক্য = কারেন্ট X রোধ।

series and paralle circuit bengali
চিত্র ১- সীরিজ ও সমান্তরাল বর্তনী।

অপরপক্ষে রোধের সমান্তরাল বর্তনীর জন্য প্রতিটি রোধের দু প্রান্তের বিভব পার্থক্য সমান। কারণ প্রতিটি রোধের দুপ্রান্ত একই বিন্দুতে যুক্ত। আর দুটি বিন্দুর মাঝে বিভব পার্থক্য হল মূলত একটি থেকে অপরটিতে কোন একক মানের আধানকে নিয়ে যেতে যে কাজ করতে হয় সেটাই। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে প্রবাহীত কারেন্টের মান আলাদা হবে। অর্থাৎ A বিন্দুর মধ্যে দিয়ে মোট যে পরিমান কারেন্ট ঢুকবে তার একটি অংশ উপরের রোধ দিয়ে ও অপর অংশ নিচের রোধ দিয়ে প্রবাহীত হবে। কারণ কারেন্ট = বিভব পার্থক্য / রোধ।

২) পৃথিবীর অভিকর্ষ বল কি এতই কম যে ছোট্ট একটি পাখিকেও মাটিতে টেনে নামাতে পারেনা?

উঃ পাখিটা তার ডানা ব্যবহার না করলে অবশ্যই পৃথিবীর অভিকর্ষ বল তাকে মাটিতে টেনে নামানোর ক্ষমতা রাখে। কিন্তু পাখি ডানা ব্যবহার করে বাতাসের উপর যে বল প্রয়োগ করে তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। বর্ষায় পিচ্ছিল রাস্তাই উল্টে পড়ার সময় হয়তো তুমি অনুভব করেছ যে অভিকর্ষ বল কতটা শক্তিশালী! প্রকৃতপক্ষে দুটো বস্তুর মধ্যে ক্রিয়াশীল অভিকর্ষ বলের মান হল,

\displaystyle F = -\frac{GMm}{r^2}

যেখানে Mm হল যথাক্রমে ওই দুটি বস্তুর ভর, G হল সর্ব্বজনীন মহাকর্ষ ধ্রুবক এবং r হল বস্তুদুটির মাঝের দূরত্ব। তবে এটা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে তড়িৎ-চুম্বকিয় বলের তুলনায় মহাকর্ষ বা অভিকর্ষ বল অনেক দূর্বল।

৩) আমরা জানি কোন কিছু আলোর বেগে চললে তার ভর বাড়ে, তাহলে আলোর কণা ফোটনেরও কি ভর বাড়ে?

উঃ- আধুনিক ধারণা অনুসারে কোন বস্তুর ভর একটি স্কেলার রাশি, অর্থাৎ যা সর্বদা একই থাকে। তার বদলে বস্তুর গতিবেগের উপর নির্ভর করে ওর ভরবেগ ও শক্তি পরিবর্তিত হয়। এই ধারণা অনুযায়ী ফোটনের ভর শূন্য। কিন্তু ওর শক্তি ও ভরবেগ যথাক্রমে h\nu এবং h\nu/c, যেখানে h হল প্ল্যাংক ধ্রুবক এবং c হল আলোর বেগ। \nu ফোটনের কম্পাঙ্ক। এবিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের আপেক্ষিকতা বিভাগের প্রবন্ধগুলো পড়ে দেখ।

৪) লিফ্ট উপরে উঠলে সেখানে রাখা বস্তুর ওজন বাড়ে ও নিচে নামলে তার ওজন কমে কেন?

উঃ – লিফ্টের মধ্যে কোন বস্তু রাখলে তার ওজন কি হবে সেটা নির্ভর করে লিফ্ট ওই বস্তুর উপর কতটা প্রতিক্রিয়া করছে তার উপর। ধর বস্তুর ভর m, তাহলে তার ওজন mg। এই ওজন লিফ্টের উপর নিচের দিকে ক্রিয়া করে, যার ফলস্বরূপ লিফ্ট বস্তুটির উপর একটি ঊর্ধ্বমুখি প্রতিক্রিয়া (R) করবে। লিফ্ট যদি স্থির থাকে তাহলে বস্তুর ওজন ও লিফ্টের প্রতিক্রিয়া পরশ্পরের সমান। অপরপক্ষে যদি লিফ্ট উপরে ওঠে বা নিচে নামতে থাকে তাহলে ব্যাপারটা একটূ আলাদা হয়।

চিত্র ২ - লিফ্টের মধ্যে বস্তু। লিফ্ট উপরে উঠলে বস্তুর ওজন আপাতভাবে বেড়ে যায় এবং নিচে নামলে কমে যায়।
চিত্র ২ – লিফ্টের মধ্যে বস্তু। লিফ্ট উপরে উঠলে বস্তুর ওজন আপাতভাবে বেড়ে যায় এবং নিচে নামলে কমে যায়।

মনে কর লিফ্ট a ত্বরণ নিয়ে উপরে উঠছে। অর্থাৎ ওর মধ্যে রাখা বস্তুরও ত্বরণ a এবং তার অভিমুখ উপরের দিকে। পাশের ছবিতে লক্ষ্য কর যে, তাহলে লিফ্টের প্রতিক্রিয়া বস্তুর ওজনের থেকে বেশি হতে হবে। কারণ কেবল তাহলেই বস্তুর উপর একটি মোট ঊর্ধ্বমুখি বল কাজ করতে পারে। অর্থাৎ,

\displaystyle R - mg = ma implies R = m(g+a)

অর্থাৎ বস্তুর ওজন আপাতভাবে বেড়ে যাবে। অপরপক্ষে যদি লিফ্ট নিচে নামে তবে লিফ্টের ঊর্ধ্বমুখি প্রতিক্রিয়া বস্তুর ওজনের থেকে অবশ্যই কম হবে যাতে বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল মোটের উপর নিচের দিকে হয়, অর্থাৎ,

\displaystyle mg - R = ma implies R = m(g-a)

তার মানে বস্তুর ওজন আপাতভাবে কমে যাচ্ছে। আশা করি ২ নং ছবিতে দেওয়া “free body diagram” গুলি থেকে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। যদি লিফ্টের ফ্রী ফল তাহলে a = g এবং R=0। অর্থাৎ বস্তুটি ভারশূন্য (weightless) হয়ে যাবে।

2 thoughts on “প্রশ্নোত্তরঃ পাঠক বন্ধুর করা বিবিধ প্রশ্নের উত্তর”

  1. Admin vaia k onek onek thanks. Ei question gula moner moddhe onek din dhore ghurtecilo, oneker kace jante chaici but aasanorup ans paini. Aajk Alhamdulilla onek kicu shikhlam. Many many thanks to desiphysics.com and salute for the admin vaia.

Leave a Reply

Your email address will not be published.