কিছুদিন আগেও হিগস বোসন ছিল খবরের শিরনামে। তবে দূঃখের কথা এই যে সংবাদপত্র এবং টিভির দৌলতে হিগস বোসন এমন একটি অদ্ভুত আলাঙ্কারিক নামে (ঈশ্বর কণা) সর্বসাধারণের মধ্যে বিখ্যাত হয়েছিল যার সাথে বিজ্ঞানের সত্যিই কোন যোগাযোগ নেই ! আর বিশ্বব্রহ্মান্ডের অস্তিত্বের সমস্ত কৃতিত্ব সাংবাদিকরা হিগস বোসনকে দিলেও, প্রকৃত কৃতিত্ব কিন্তু ছিল হিগস ফিল্ডের। এটা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে-র একটি জ্বলন্ত উদাহরণ! এই হিগস ফিল্ডের উপর কাজের জন্য ব্রিটিশ পদার্থবিদ পিটার হিগস ২০১৩ সালের নোবেল পুরষ্কার পান। আজ চল আমরা বোঝার চেষ্টা করি কি এই হিগস ফিল্ড ও হিগস বোসন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, কণা পদার্থবিদ্যায় হিগস ফিল্ড হল বিশ্বব্রহ্মান্ডের সর্বত্র বিস্তৃত এমন একটি কোয়ান্টাম ফিল্ড যার সাথে মিথষ্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশনের ফলেই ইলেকট্রন, মিউঅন, টাউ, নিউট্রিনো, কোয়ার্ক, W এবং Z বোসন – প্রকৃতির এই মৌলিক কণাগুলি তাদের ভর লাভ করে। কথাটা শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে; ভর লাভ করে কথাটার আবার মানে কি? এই ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য প্রায়ই একটি বিখ্যাত উদাহরণ দেওয়া হয়। ধর জেনিভাতে কণা পদার্থবিদদের একটি সম্মেলন হচ্ছে। ওখানে একসাথে অনেক বিজ্ঞানী জড় হয়েছেন। এমন সময় সেথায় পিটার হিগস পৌঁছলেন। মনে কর তার সাথে একইসাথে সেখানে এক দেশীয় পদার্থবিদও গিয়ে হাজির হল। দুজনেই হাঁটছেন। কিন্তু পিটার হিগসকে দেখামাত্র তার চারধারে অন্যান্য সব পদার্থবিদরা জড় হবে – কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য, কেউ বা করমর্দনের জন্য আবার কেউ বা শুধুই অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। এই সবের ফলে পিটার হিগসের গতি মন্থর হয়ে যাবে। অপরপক্ষে আমাদের দেশীয় পদার্থবিদকে যেহেতু কেউই চেনেনা তাই সে স্বচ্ছন্দে চলে যেতে পারবে। সুতরাং এই ব্যক্তির সাথে পিটার হিগসের গতি তুলনা করলে মনে হবে যেন সম্মেলনের ঘরে পৌঁছানো মাত্র সেখানকার লোকজনের সাথে ইন্টারঅ্যাকশনের ফলে পিটার হিগসের ভর বেড়ে গেছে (যেহেতু ভারী বস্তু আস্তে চলে)। অনেকটা একইভাবে যে সমস্ত মৌলিক কণা হিগস ফিল্ডের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করতে পারে তারা নিজেদের ভর ওই মিথষ্ক্রিয়ার ফলেই লাভ করে। তবে এখানে উল্লেখযোগ্য যে উপরের উদাহরণের মত ভর লাভ করার জন্য হিগস ফিল্ডের মধ্যে দিয়ে কণার গতি কিন্তু আবশ্যক নয়; কেবল মিথষ্ক্রিয়া বা \interaction প্রয়োজন। আর হিগস বোসন হল এই হিগস ফিল্ডের কোয়ান্টা, যেমন আলোর কোয়ান্টা হল ফোটন। [বিঃদ্রঃ – আগেই বলে দিচ্ছি আজকের এই পোস্টটি কিন্তু অনেকটাই দীর্ঘ।]
ফিল্ড ও তার কোয়ান্টা
হিগস ফিল্ড ও হিগস কণার সম্পূর্ণ গাণিতিক বিবরণ রীতিমত কঠিন কাজ। বিশেষত একটি বা দুটি পোস্টে তো তা কোনমতেই সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে যখন আমরা কণা পদার্থবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করব, তখন হিগস ফিল্ড সম্মন্ধে বিশদে বলব। অপরপক্ষে যেহেতু আমাদের এই ব্লগের নিয়ম হল যে প্রত্যেকটি পোস্টে খানিকটা হলেও গাণিতিক বিবরণ থাকতে হবে, তাই আজ আমরা অপেক্ষাকৃত সহজ অংকের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করব কিভাবে হিগস ফিল্ডের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার ফলে মৌলিক কণাগুলি তাদের ভর লাভ করতে পারে। তবে তার আগে আমরা একটু জেনে নেব ফিল্ড ও তাদের কোয়ান্টা সম্মন্ধে। ফিল্ড (বাংলাতে ক্ষেত্র বলা যেতে পারে, কিন্তু আমরা “ফিল্ড” শব্দটিই ব্যবহার করব এই পোস্টে) আসলে আমাদের অতি পরিচিত একটি বিষয়। যেমন তোমার চারিদিকে বাতসের ঘনত্ব একটি ফিল্ড; বা তামপাত্রার ফিল্ড; কিংবা কোনো হ্রদের তলদেশ হতে জলের পৃষ্ঠতলের উচ্চতার ফিল্ড। মোদ্দা কথা হল এই যে ফিল্ড হল এমন এক ধরনের ভৌত রাশি যার স্পেস-টাইমের (স্থান-কালের) প্রত্যেক বিন্দুতে একটি মান আছে। যেমন আমাদের চারপাশে প্রত্যেক বিন্দুতে বাতাসের ঘনত্বের একটি মান আছে, তেমনি প্রত্যেক বিন্দুতে তাপমাত্রারও একটি মান রয়েছে। তাই এরা হল ফিল্ড। হ্রদের প্রত্যেক বিন্দুতে ওর তলদেশ থেকে জলতলের উচ্চতারও নির্দিষ্ট মান রয়েছে, তাই এই উচ্চতাও একটি ফিল্ড। গণিতের ভাষায় ফিল্ড হল স্থান ও কালের ফাংশন মাত্র। এবারে কোন ফিল্ডের মধ্যে যদি আলোড়ন তৈরি করা যায় তাহলে স্বভাবতই ওই ফিল্ডে তরঙ্গ বা ঢেই উঠবে। যেমন বাতাসে তুমি যদি হাত নাড়, বা একটি স্পীকার বাজাও তবে বাতাসে শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি হবে যা মূলত বাতাসে ঘনত্বের পরিবর্তনের ঢেউ। অনুরুপ ভাবে হ্রদের জলে ঢিল ছুড়লে জলের পৃষ্ঠতলের উচ্চতায় আন্দোলন তৈরি হয় যাকে আমরা ঢেউ বলি। বিজ্ঞানের পরিভাষায় শব্দ তরঙ্গ হল সময়ের সাথে স্থানের বিভিন্ন বিন্দুতে বাতাসের ঘনত্বের পরিবর্তন, আর হ্রদের ঢেউ হল জলের পৃষ্ঠতলের উচ্চতায় সময় ও স্থান নির্ভরশীল পরিবর্তন। তোমরা আরও জানো যে যেকোন রকমের আন্দোলনকে (oscillation) ফুরিয়ের সিরিজ ব্যবহার করে এক বা একাধিক সরল দোলগতির সমন্বয় হিসেবে আমরা লিখতে পারি। সুতরাং বলা যায় যে কোন ফিল্ডে সৃষ্ঠ আলোড়ন হল মূলত এক বা একাধিক সরল দোলগতির সমাহার।
ফিল্ড সংক্রান্ত উপরের আলোচনার পুরোটাই ক্লাসিকাল বলবিজ্ঞান নির্ভর এবং ওই ফিল্ডগুলোকে বলা হয় ক্লাসিকাল ফিল্ড। এবারে আমরা কোয়ান্টাম জগতে প্রবেশ করব। কোয়ন্টাম মেকানিক্সে সরল দোলগতির আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে সরল দোলকের (বা ওর আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট তরঙ্গের) শক্তি এবং আন্দোলনের বিস্তার amplitude আসলে কোয়ান্টাইজড। সুতরাং কোন কোয়ান্টাম ফিল্ডে যে ঢেউ বা তরঙ্গের সৃষ্টি হবে তার বিস্তার এবং শক্তিও হবে কোয়ান্টাইজড। যেমন কোয়ান্টাম ফিল্ডে সৃষ্ট তরঙ্গের বিস্তার, তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কম্পাঙ্ক যদি যথাক্রমে এবং
হয় তবে ওই তরঙ্গের শক্তি
,
(1)
যেখানে, (2)
ইত্যাদি হল শূন্য সহ একটি ধণাত্মক পূর্ণসংখ্যা এবং প্লাংক ধ্রুবক। (1) নম্বর সমীকরণ থেকে দেখা যায় যে কণার শক্তি কেবলমাত্র “স্টেপ বাই স্টেপ” বাড়ানো বা কমানো যায় এবং এক একটি স্টেপের শক্তির পরিমান
(এটা অনেকটা সিঁড়ি দিয়ে ওঠা বা নামার মত ব্যাপার। এক পদক্ষেপে ন্যুনতম একটি সিঁড়ি উঠতে বা নামতেই হবে)। শক্তির এই ন্যুনতম পরিমানকে বলা হয় “কোয়ান্টা” (যেমন আলোর কোয়ান্টা হল ফোটন)। অর্থাৎ বলা যায় যে কোয়ান্টাম ফিল্ডে সৃষ্ট কোন নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ আসলে
সংখ্যক কোয়ান্টার সমন্বয়ে গঠিত। এই কোয়ান্টাগুলিই হল ওই কোয়ান্টম ফিল্ডের কণা বা পার্টিকল। তার মানে কণা হচ্ছে কোন কোয়ান্টাম ফিল্ডে আন্দোলনের কোয়ান্টাইজড রূপ। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরী অনুসারে আমাদের জানা সমস্ত মৌলিক কণা যেমন ইলেকট্রন, মিউয়ন, টাউ, নিউট্রিনো, কোয়ার্ক, গ্লুঅন, W ও Z বোসন, ফোটন এবং হিগস বোসন – এসবই হল তাদের নিজেদের কোয়ান্টাম ফিল্ডে আন্দোলনের কোয়ান্টাম মাত্র। জলে ঢিল ছুড়লে যেমন তরঙ্গ সৃষ্টি হয় তেমনি কোন কোয়ান্টাম ফিল্ডে আলোড়ন সৃষ্টি করলে ওই ফিল্ডের কোয়ান্টা তৈরি হয়। [বিঃদ্রঃ- এখানে তোমাদের মনে করিয়ে দেব যে (1) নং সমীকরণে
বসালে যে শক্তি পাওয়া যায় তাকে জিরো পয়েন্ট শক্তি বলা হয়। এটা কোন কোয়ান্টাম ফিল্ডের স্বতঃস্ফূর্ত আলোড়নের ফলে সৃষ্ঠ শক্তি এবং এই স্বতঃস্ফূর্ত আলোড়নের কারণ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি।]
এবারে বলব কণা পদার্থবিদ্যায় হিগস ফিল্ড আমদানী করার কি প্রয়োজন ছিল সেটা। তোমরা সকলেই জানো যে প্রকৃতিতে চার ধরনের বল আছে – ইলেকট্রোম্যাগনেটিক (তড়িৎ-চুম্বকীয়), উইক, স্ট্রং এবং গ্র্যাভিটেশনাল (মহাকর্ষ)। আলোচনার সুবিধের জন্য এগুলোর ফিল্ডকে আমরা বলব “ফোর্স ফিল্ড” (force field)। এছাড়াও ইলেকট্রন, মিউঅন, টাউ, নিউট্রিনো, কোয়ার্ক প্রমুখ তথাকথিত পদার্থের মৌলিক কণাদের কোয়ান্টাম ফিল্ডকে আমরা বলব ম্যাটার ফিল্ড (matter field)। এখানে উল্লেখ্য যে ইলেকট্রন, মিউঅন, টাউ, বিভিন্ন নিউট্রিনো এবং কোয়ার্কেরা হল -স্পিনযুক্ত কণা যাদের বলা হয় ফার্মিয়ন। ফোর্স ফিল্ডগুলির মাঝে কেবল মহাকর্ষ বল ছাড়া আর বাকিগুলোর সফল কোয়ান্টাম তত্ত্ব তৈরি করা সম্ভব হয়েছে এখোনো পর্যন্ত। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ও স্ট্রং ফোর্সের কোয়ান্টা হল যথাক্রমে ফোটন ও গ্লুঅন, এবং উইক ফোর্স ফিল্ডের কোয়ান্টা হল W ও Z বোসন। এই কণাগুলির মাঝে একটি বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তা হল এই যে ফোটন ও গ্লুঅন যদিও ভরহীন কণা, কিন্তু W ও Z বোসনের ভর যথাক্রমে
ও
GeV। ম্যাটার ফিল্ড ও ফোর্স ফিল্ডের মাঝে মিথষ্ক্রিয়া (\interaction) কেমন হবে তা নির্ণয় করা হয় “লোকাল গেজ ইনভ্যারিয়েন্স (local gauge invariance)” নামের একটি নিয়ম ব্যবহার করে। এই নিয়ম প্রয়োগ করলে দেখা যায় যে ফোর্স ফিল্ডের কোয়ান্টাদের অতি অবশ্যই ভরহীন হতে হবে। অতএব উইক ফিল্ডের কোয়ান্টা W ও Z বোসনের ভর কণা পদার্থবিদ্যায় একটি সমস্যা। আর এই সমস্যা সমাধানের জন্যই প্রয়োজন হিগস ফিল্ড। বলা হয় যে এই হিগস ফিল্ডের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার ফলেই W ও Z বোসনের ভর প্রাপ্তি হয়। শুধু তাই নয় বর্তমানে মেনে নেওয়া হয়েছে যে ফোর্স ফিল্ড ও ম্যাটার ফিল্ড উভয়েরই মৌলিক কণাগুলি মূলত ভরহীণ। শুধু ফোটন ও গ্লুওন ছাড়া আর বাকি সকলে তাদের নিজেদের ভর লাভ করে হিগস ফিল্ডের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে।
প্রকৃতির উপর নির্ভর করে ফিল্ডের শ্রেণীবিভাগ করা যায়। যেমন বাতাসের ঘনত্ব, তাপমাত্রা বা হ্রদের জলতলের উচ্চতা এরা হল স্কেলার রাশি। তাই বাতাসের ঘনত্বের ফিল্ড, তাপমাত্রার ফিল্ড বা হ্রদের জলতলের উচ্চতার ফিল্ড হল স্কেলার ফিল্ড। কোয়ান্টাম ফিল্ড তত্ত্বে শূন্য স্পিনযুক্ত কণাদের ফিল্ডকে বলা হয় স্কেলার ফিল্ড। পাইওন ফিল্ড, হিগস ফিল্ড ইত্যাদি হল স্কেলার ফিল্ডের উদাহরণ। আবার তড়িৎ ও চুম্বকীয় ক্ষেত্র হল ভেক্টর রাশি, ফলস্বরূপ তড়িচ্চুম্বকীয় বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড হল ভেক্টর ফিল্ড। ভেক্টর ফিল্ডের আরও উদাহরণ হল উইক ফিল্ড এবং স্ট্রং ফিল্ড। ভেক্টর ফিল্ডের কোয়ান্টার স্পিন হয় “1”। আরেক ধরনের ফিল্ড আছে, যার নাম স্পাইনর ফিল্ড। ইলেকট্রন, মিউঅন, টাউ, নিউট্রিনো ও কোয়ার্ক ইত্যাদি ” ” -স্পিনযুক্ত কণাদের ফিল্ড এই শ্রেণীভুক্ত। আজকের আলোচনায় আমরা উদাহরণ হিসেবে স্কেলার ফিল্ড নিয়েই সমস্ত অংক করব। ভেক্টর বা স্পাইনর ফিল্ডের গণিত অপেক্ষাকৃত অনেক কঠিন। সেগুলো পরে যখন কণা পদার্থবিদ্যা নিয়ে বিশদে আলোচনা করব তখন দেখা যাবে। [বিঃদ্রঃ – নিচের অংশ পড়তে হলে খাতা কলম নিয়ে বসতে হবে। কেন স্কেলার ফিল্ডের স্পিন শূন্য বা ভেক্টর ফিল্ডের স্পিন 1, সে সম্মন্ধে পরে একটি পোস্টে আলোচনা করব।] যাইহোক এতক্ষণ ধরে অনেক কথা বললাম, চল এবার একটু অংক কষা যাক। দেখা যাক দুটি ফিল্ডের মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে ফিল্ড কোয়ান্টা কিভাবে ভর লাভ করতে পারে। সেজন্য প্রথমে আমরা একটি ফিল্ডের জন্য প্রয়োজনীয় সমীকরণ বের করব।
স্কেলার ফিল্ডের সমীকরণ
কোন স্কেলার ফিল্ডে আলোড়ন সৃষ্টি করলে যে তরঙ্গ তৈরি হয় তা যে সমীকরণ মেনে চলে সেটা হল (যাকে ওই ফিল্ডের সমীকরণ বলা হয়),
(3)
যেখানে ও
হল যথাক্রমে শূন্যস্থানে আলোর বেগ ও প্লাংক ধ্রুবক।
হল ওই ফিল্ডে কোয়ান্টার ভর। (3) নম্বর সমীকরণ কিভাবে এল সেটা সহজেই বের করা যায়। বিশেষ আপেক্ষিকতা অনুসারে
ভরবিশিষ্ট (স্থিরাবস্থায় ভর বা rest mass) কণার শক্তি
,
(4)
যেখানে হল কণার রৈখিক ভরবেগ ও
শূন্যস্থানে আলোর বেগ। সমীকরণটিকে কোয়ান্টাইজ করে স্কেলার ফিল্ডের সমীকরণ পাওয়া যায় [
সমীকরণের কোয়ান্টাইজড রূপ যেমন শ্রোডিঙ্গার সমীকরণ, এটাও ঠিক তেমন ব্যাপার]। কোয়ান্টাম মেকানিক্স থেকে তোমরা জানো যে ভরবেগ ও শক্তির অপারেটর,
এবং
হল যথাক্রমে
ও
অক্ষ বরাবর ভরবেগ এবং
। যদি
স্কেলার ফিল্ড হয় তবে এই অপারেটরগুলো ব্যবহার করে (4) নং সমীকরণ থেকে,
বা, (5)
বিশেষ আপেক্ষিকতার প্রতীক-গুচ্ছ (notation) ব্যবহার করলে (5) নম্বর সমীকরণ দেখতে এরকম দাঁড়ায়,
(6)
যেখানে -এর মান 0, 1, 2 ও 3।
এবং
অতএব স্কেলার ফিল্ডের সমীকরণ [যা কিনা (4) নং সমীকরণের কোয়ান্টাইজড রূপ মাত্র],
বা,
আরও একটু সহজ করার জন্য আমরা শুধু একমাত্রিক স্থান নিয়েই মাথা ঘামাব। সুতরাং একমাত্রিক স্থানে ফিল্ডের সমীকরণ,
(7)
যদি ফিল্ড কোয়ান্টার ভর শূন্য হয় () তবে সেই ফিল্ডের জন্য সমীকরণ,
(8)
এটা অতি পরিচিত তরঙ্গের সমীকরণ। একমত্রিক ফিল্ড সমীকরণের [(7) নং] সমাধান
(9)
অর্থাৎ (7) নং স্কেলার ফিল্ডের সমীকরণ মূলত একটি প্লেন ওয়েভ প্রকাশ করে যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য, এবং কম্পাঙ্ক
। স্পষ্টতই এই প্লেন ওয়েভের প্রত্যেক বিন্দুর আন্দোলন (
vs.
গ্রাঁফে)
রেখার সাপেক্ষে হচ্ছে, যা ওই ফিল্ডের সাম্যমান (equilibrium value)। এবারে চল এই স্কেলার ফিল্ডের সমীকরণে একটু পরিবর্তন করি।
(10)
স্পষ্টতই এই পরিবর্তিত স্কেলার ফিল্ডের সমাধান,
অর্থাৎ এখন এই তরঙ্গের সাম্যমান । সুতরাং (10) নং সমীকরণ মেনে চলা কোন স্কেলার ফিল্ডে যদি আমরা কোনভাবে আলোড়ন তৈরি করি তাহলে ওই ফিল্ড
-এর (যা
vs.
গ্রাঁফে
অক্ষের সমান্তরাল একটি রেখা) সাপেক্ষে দুলতে থাকবে। আর এই দোলনের কোয়ান্টাইজড রূপই হল ওই ফিল্ডের কোয়ান্টা যাদের ভর
। মনে রাখবে কোয়ান্টাম ফিল্ডে এই তরঙ্গের বিস্তার ও শক্তি কিন্তু কোয়ান্টাইজড।
ইন্টারেক্টিং স্কেলার ফিল্ড ও কোয়ান্টার ভর প্রাপ্তি
এবারে মনে কর আমাদের কাছে দুটো স্কেলার ফিল্ড ও
আছে। দুটোর ক্ষেত্রেই ফিল্ডের সাম্যমান শূন্য। ধরে নেব যে
ফিল্ডের কোয়ান্টার ভর
এবং
ফিল্ডের কোয়ান্টা ভরহীণ। তাহলে,
(11)
(12)
(11) ও (12) স্কেলার ফিল্ডদুটো পরষ্পরের সাথে কোনরকম মিথষ্ক্রিয়া (\interaction) করছেনা। এবারে ধর যদি সমীকরণদুটোকে নিচে যেরকম দেওয়া হয়েছে সেভাবে পরিবর্তিত করা হয় তবে,
(13)
(14)
সুতরাং এখন ফিল্ডের মান
ফিল্ডের উপর এবং
ফিল্ডের মান
ফিল্ডের উপর নির্ভর করে। এটা মূলত দুটো সংযোজিত দোলকের (coupled oscillator) মত ব্যাপার। অর্থাৎ এই দুটি সমীকরণ এটাই বোঝায় যে ফিল্ড দুটি মিথষ্ক্রিয়া বা ইনটারেক্ট করছে পরষ্পরের সাথে।
কে বলা হয় দুটি ফিল্ডের মিথষ্ক্রিয়া বা \interaction এর জন্য কাপলিং ধ্রুবক। দেখা গেছে যে কণা পদার্থবিদ্যায় সবসময়ই সাম্যমানের সাপেক্ষে ফিল্ডের আন্দোলনের বিস্তার খুবই সামান্য হয়। যেহেতু আমাদের আলোচ্য দুটি ফিল্ডের সাম্যমানই শূন্য, তাই ব্যবহারিক সমস্ত ক্ষেত্রেই
ও
খুবই ক্ষুদ্র। অর্থাৎ
এবং
– দুটোই খুবই ক্ষুদ্র রাশি যাদেরকে আমরা নগন্য বলে মেনে নিতে পারি। এমতাবস্থায় (13) এবং (14) নম্বর সমীকরণ যথাক্রমে (11) ও (12) নং সমীকরণে পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ এখোনো
ফিল্ড কোয়ান্টার ভর
ও
ফিল্ডের কোয়ান্টা ভরহীণ। এবারে মনে কর যে
ফিল্ডের সাম্যমান শূন্য না হয়ে
হল, এবং এই নতুন সাম্যমানের সাপেক্ষে ফিল্ডের আন্দোলনকে আমরা যদি
দিয়ে প্রকাশ করি তবে,
।
যদি দুটো ফিল্ড পরষ্পরের সাথে মিথোষ্ক্রিয়া না করে তবে এখন ফিল্ডের সমীকরণ (10 নং ব্যবহার করে) হবে,
অতএব যদি দুটো ফিল্ড পরষ্পরের সাথে ইন্টারেক্ট করে তবে,
(15)
(14)
এর বদলে
ব্যবহার করে (14) ও (15) নং সমীকরণ দাঁড়ায় [যেহেতু
],
(16)
(17)
যেহেতু সাম্যমানের সাপেক্ষে সর্বদাই ফিল্ডের আন্দোলনের বিস্তার খুব কম হয় তাই এক্ষেত্রে ও
ক্ষুদ্র রাশি। (16) ও (17) নং সমীকরণদুটোকে একটু সরল করে লিখলে,
(18)
(19)
যেহেতু ও
ক্ষুদ্র রাশি, তাই উপরের দুটি সমীকরণ থেকে
, ও
যুক্ত পদগুলিকে নগন্য বলে বাদ দিয়ে আমরা পাই,
বা, (20)
এবং,
(21)
এবারে দেখ ফিল্ডের সমীকরণে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটেছে। মিথষ্ক্রিয়ার ফলে যদিও ফিল্ড কোয়ান্টার ভরের কোন পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু
ফিল্ডের সমীকরণের অদ্ভুত রূপান্তর হয়েছে।
ফিল্ডের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার ফলে
ফিল্ডের সমীকরণ ভরযুক্ত ফিল্ডের সমীকরণে রূপান্তরিত হয়েছে, অর্থাৎ
ফিল্ডের কোয়ান্টা ভর লাভ করেছে। স্পষ্টতই, যদি এই ভরের মান
হয় তবে (10) নম্বর সমীকরণের সাথে তুলনা করে,
(22)
অর্থাৎ যদি ফিল্ডের সাম্যমান শূন্য না হয় তবে
ও
ফিল্ডের পারষ্পারিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে
ফিল্ডের কোয়ান্টা ভর লাভ করে। এই ভরের মান ওই দুটো ফিল্ডের মিথোষ্ক্রিয়ার কাপলিং ধ্রুবক ও
ফিল্ডের সাম্যমানের উপর নির্ভর করে।
হিগস ফিল্ড এইভাবেই কাজ করে। দেখা যায় যে সবরকম মৌলিক কণার জন্য ফিল্ডের সমীকরণ প্রকৃতিগতভাবে ভরহীণ কণার সমীকরণ। কিন্তু এদের মধ্যে কিছু কিছু ফিল্ডের সমীকরণে হিগস ফিল্ডের সাথে উপরের উদাহরণে যেরকম দেখানো হয়েছে সেরকম মিথষ্ক্রিয়ার ফলে ওই ফিল্ড কোয়ান্টার ভরের জন্য দায়ী পদের আবির্ভাব হয়, কারণ হিগস ফিল্ডের সাম্যমান শূন্য নয়। সুতরাং এক কথায় বলতে গেলে বলা যায় যে হিগস ফিল্ডের সাম্যমান শূন্য না হওয়ার দরুন ওর সাথে মিথষ্ক্রিয়ার ফলে প্রকৃতগতভাবে ভরহীণ বিভিন্ন মৌলিক ফিল্ডের কোয়ান্টা, যেমন ইলেকট্রন, মিউঅন, টাউ, কোয়ার্ক, নিউট্রিনো এবং W ও Z বোসন ভর লাভ করে। কোন ফিল্ডের সাথে হিগস ফিল্ডের মিথষ্ক্রিয়া (\interaction) যত বেশি প্রবল হবে ওই ফিল্ড কোয়ান্টার ভরও তত বেশি হবে। উল্লেখ্য যে ইলেকট্রওম্যাগনেটিক এবং স্ট্রং ফিল্ড হিগস ফিল্ডের সাথে মিথোষ্ক্রিয়া করেনা বলে এদের ফিল্ড কোয়ান্টা যথাক্রমে ফোটন ও গ্লুঅন ভরহীণই থেকে যায়। হিগস ফিল্ডের সাম্যমান কেন শূন্য হয়না সেটা জানতে গেলে আমাদের ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান সম্মন্ধে একটু জানতে হবে।
ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান
ক্লাসিকাল বলবিদ্যা থেকে আশা করি সকলেই কোন সিস্টেমের ল্যাগরেঞ্জিয়ানের সাথে পরিচিত। যদি কোন কণার গতি ও স্থিতিশক্তি যথাক্রমে এবং
হয় তবে ওর ল্যাগরেঞ্জিয়ান,
এই ল্যাগরেঞ্জিয়ান কণার অবস্থান ও ভরবেগের ফাংশন। অয়লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণ ব্যবহার করে আমরা ওই কণার গতির সমীকরণ লিখে ফেলতে পারি,
এখানে হল ওই কণার ত্রিমাত্রিক স্থানাঙ্ক। একইরকমভাবে ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান ব্যবহার করে ওর সমীকরণ লেখা যায়। তবে ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান হল ওই ফিল্ড এবং স্থান ও কালের সাপেক্ষে ওই ফিল্ডের প্রথম ডেরিভেটিভের ফাংশন। অর্থাৎ
। প্রকৃতপক্ষে
হল ল্যাগরেঞ্জিয়ান ঘনত্ব, যাকে ফিল্ড তত্ত্বে সংক্ষেপে ল্যাগরেঞ্জিয়ান বলা হয়। [সত্যিকারের ল্যাগরেঞ্জিয়ান
,
হল স্পেসে ক্ষুদ্র স্থানের আয়তন।] ল্যাগরেঞ্জিয়ান ঘনত্ব ব্যবহার করে ফিল্ডের সমীকরণ (যেহেতু বিশেষ আপেক্ষিকতায় স্পেস ও টাইম সমতুল্য, তাই অয়লার-ল্যাগরেঞ্জ সমীকরণটিকে ফিল্ডের উপযোগী করার জন্য এমনভাবে পরিবর্তিত করা হয় যাতে সেটাতেও স্থান ও কালের সমতুল্য ভূমিকা থাকে),
বিশেষ আপেক্ষিকতার প্রতীক-গুচ্ছ ব্যবহার করে,
(23)
সমতুলভাবে উর্দ্ধ সূচক ব্যবহার করে,
(24)
একটি উদাহরণ নেওয়া যাক। মনে কর কোন স্কেলার ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান
(25)
বা,
সুতরাং, (বিশ্বাস না হলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে করে দেখ।)
এবং,
অতএব, (23) নং সমীকরণ ব্যবহার করে ফিল্ডের সমীকরণ,
বলাই বাহুল্য যে এটাই সেই স্কেলার ফিল্ডের সমীকরণ যার সাথে আগেও পরিচিত হয়েছো। তাহলে (25) নম্বর সমীকরণ সত্যিই এই স্কেলার ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান। ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ানে এর কোফিসিয়েন্ট ঋণাত্মক হলে সেই কোফিসিয়েন্ট থেকে ফিল্ড কোয়ান্টার ভর নির্ণয় করা যায়।
স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসমতা ভাঙ্গন (spontaneous symmetry breaking)
এবারে প্রশ্ন হচ্ছে যে অন্যান্য সমস্ত মৌলিক ফিল্ডের মত হিগস ফিল্ডের সাম্যমান শূন্য হয়না কেন? এর উত্তর হল স্বতস্ফূর্ত প্রতিসমতা ভাঙ্গন নামের (spontaneous symmetry breaking) একটি পদ্ধতি। প্রথমে দেখা যাক প্রতিসমতা ভাঙ্গন কি জিনিস। ধর ঘণকের আকারের একটি ঘর মহাশূন্যের কোথাও রাখা আছে, যেখানে মহাকর্ষ বল নেই। তাহলে বলতো ওই ঘরের উপর-নিচ বা ডান-বাম কি আলাদা করা সম্ভব? বুঝতেই পারছ যে এই প্রশ্নের উত্তর হল যে ওই ঘরের উপর-নিচ বলে কিছু নেই এবং ঘরটির সবগুলি দিকই সমতুল্য বা ঘরটি সব দিকের সাপেক্ষে প্রতিসম। কিন্তু যদি এবারে ওখানে মহাকর্ষ বল চালু করা হয়, তবে ওই বলের দিক অনুসারে উপর ও নিচ তৈরি হবে। অর্থাৎ এখন উপর-নিচ চিহ্নিত করা সম্ভব এবং ঘরটি আর সব দিকের সাপেক্ষে প্রতিসম রইল না। এটা হল প্রতিসমতা ভেঙ্গে যাওয়ার একটি উদাহরণ। এক্ষেত্রে বাইরে থেকে প্রযুক্ত মহাকর্ষ বলের প্রভাবে প্রতিসমতার ভাঙ্গন হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে কোন বাইরের প্রভাব ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিস্টেমের প্রতিসমতা ভেঙ্গে যায়। নিজে নিজেই প্রতিসমতা ভেঙ্গে যাওয়ার এই পদ্ধতিকে বলা হয় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসমতা ভাঙ্গন বা spontaneous symmetry breaking। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। এটা গ্রীফিথের লেখা Particle physics বই থেকে নেওয়া। মনে কর একটি পাতলা রবারের স্কেলকে তুমি তোমার হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মাঝে উল্লম্বভাবে রেখে বল প্রয়োগ করছ। এই প্রযুক্ত বল কিন্তু উল্লম্ব অক্ষের সাপেক্ষে প্রতিসম এবং বলের প্রভাবে স্কেলটির ডানদিক কিংবা বাদিকে বেঁকে যাওয়ার সম্ভাবনা সমান। কিন্তু বলটি যেইমাত্র যেকোন একদিকে বেঁকে যাবে সঙ্গে সঙ্গে তার ওই প্রতিসমতা নষ্ট হবে। এটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসমতা ভাঙ্গনের একটি উদাহরণ। প্রযুক্ত বল উল্লম্ব অক্ষের সাপেক্ষে প্রতিসম হওয়া সত্বেও স্কেলটি সাম্যাবস্থায় নিজে নিজেই একদিকে বেঁকে গিয়ে ওই প্রতিসমতা ভেঙ্গে দেয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্সেও এরকম ঘটনা ঘটে যেখানে দেখা যায় যে কোন সিস্টেমের হ্যামিল্টোনিয়ান বা ল্যাগরেঞ্জিয়ান প্রতিসম হলেও সিস্টেমের গ্রাউন্ড স্টেটে ওই প্রতিসমতা বজায় থাকেনা। এইবার আমরা হিগস ফিল্ডের দিকে নজর দেব।
মনে কর যে (25) নম্বর সমীকরণের ল্যাগরেঞ্জিয়ান হিগস ফিল্ডের জন্য দায়ী। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে এই ফিল্ডের কোয়ান্টার ভর । যদি এই ল্যাগরেঞ্জিয়ানকে স্থিতিশক্তি
ও গতিশক্তিতে
আলাদা করা হয় তবে,
এবং
তোমরা জানো কোন সিস্টেমের সাম্যাবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত হল যে পোটেনশিয়ালের মান সর্বনিম্ন হতে হবে, অন্ততপক্ষে স্থানীয়ভাবে। উপরোক্ত পোটেনশিয়ালের মান সর্বনিম্ন হতে হলে,
অর্থাৎ সাম্যাবস্থায় ফিল্ডের মান বা সাম্যমান শূন্য। সুতরাং এই ফিল্ড হিগস ফিল্ড হতে পারেনা। এবারে অন্য আরেকটি ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান নিয়ে পরীক্ষা করা যাক,
(26)
এবং
হল ধনাত্মক। এই ল্যাগরেঞ্জিয়ান দেখে কি বলতে পার যে ফিল্ড কোয়ান্টার ভর কত? উত্তর হল, না, কারণ এখানে
যুক্ত পদের চিহ্ন ধনাত্মক। আরও একটি বিষয় লক্ষ্য কর। যেহেতু এই ল্যাগরেঞ্জিয়ানের সমীকরণে
এর শুধু যুগ্ম ঘাত রয়েছে, তাই
কে
দিয়ে প্রতিস্থাপিত করলেও ল্যাগরেঞ্জিয়ান অপরিবর্তিত থাকে। অর্থাৎ বলা যায় যে ল্যাগরেঞ্জিয়ান প্রতিফলনের সাপেক্ষে প্রতিসম। এবারে চল এই ফিল্ডের সাম্যাবস্থার মান বের করা যাক। এখানে স্থিতিশক্তি,
অতএব,
বা,
যেখানে
কে আরও একবার
এর সাপেক্ষে ডিফারেনশিয়েট করে দেখানো যায় যে
পোটেনশিয়ালে একটি ম্যাক্সিমাম বিন্দু। তাই এই বিন্দু একটি অস্থির সাম্যাবস্থা প্রকাশ করে। অপরপক্ষে
বিন্দু দুটিতে পোটেনশিয়ালের মান সর্বনিম্ন, তাই এই দুটি বিন্দুই ফিল্ডের প্রকৃত সাম্যাবস্থা। ১(b) নং ছবিতে এটাই দেখানো হয়েছে।

আমরা আগেই দেখেছি যে সাম্যমানের সাপেক্ষে কোয়ান্টাম ফিল্ডের আন্দোলন খুব সামান্য হয়। মনে কর ফিল্ডের সাম্যাবস্থায় মান হল । যদি
হয় (অর্থাৎ
হল ফিল্ডের সাম্যমানের সাপেক্ষে আন্দোলন) তবে, (26) নম্বর সমীকরণ থেকে,
(27)
এই সমীকরণকে একটু সরল করে ও ব্যবহার করে,
(28)
এটাই হল সাম্যবিন্দুর সাপেক্ষে আন্দোলনের জন্য ফিল্ডের ল্যাগরেঞ্জিয়ান। দেখ যে এটাতে এর জায়গায়
বসালে ল্যাগরেঞ্জিয়ানের মান আর একই থাকছে না। প্রারম্ভিক ল্যাগরেঞ্জিয়ানের প্রতিফলনের সাপেক্ষে যে প্রতিসমতা ছিল তা এই ল্যাগেরেঞ্জিয়ান থেকে হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ স্বত:স্ফূর্তভাবে ল্যাগরেঞ্জিয়ানের প্রতিসমতা ভেঙ্গে গেছে এবং সাম্যাবস্থায় ফিল্ডের মান শূন্য নয়। এটা অনেকটা রবারের স্কেলের উদাহরণটির মত। প্রারম্ভিক ল্যাগরেঞ্জিয়ানের প্রতিসমতা থেকে বোঝা যায় যে গ্রাউন্ড স্টেটে ফিল্ডটির
বা
সাম্যমানে যাওয়ার সম্ভাবনা সমান, কিন্তু ওদের মধ্যে যেকোন একটিতে ফিল্ড একবার চলে গেলে ওই প্রতিসমতা ভেঙ্গে যায়। অর্থাৎ স্থিতিশীল সাম্যাবস্থা অর্জনের জন্য গ্রাউন্ড স্টেটে প্রারম্ভিক ল্যাগরেঞ্জিয়ানে প্রতিফলের সাপেক্ষে প্রতিসমতা স্বত:স্ফূর্তভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। (28) নং সমীকরণ থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট। তা হল যে
এর কোফিসিয়েন্ট বা সহগ ঋনাত্মক। সুতরাং ওই সহগ থেকে ফিল্ড কোয়ান্টার ভর
বের করা যায়।
(29)
এখানে এটা উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রয়োজন যে ফিল্ড ও
ফিল্ড প্রকৃতপক্ষে একই ফিল্ডের দুটি ভিন্ন রূপ। (26) নং সমীকরণ থেকে ফিল্ড কোয়ান্টার ভর বের করা সম্ভব নয় [অবশ্য এর কারণ আমাদের গাণিতিক সীমাবদ্ধতা], কিন্তু
এর স্থিতিশীল সাম্যমানের সাপেক্ষে ফিল্ডটিকে একটু সাজিয়ে লিখলে সহজেই ফিল্ড কোয়ান্টার ভর সামনে চলে আসে। অতএব (26) নং সমীকরণের
ফিল্ড হিগস ফিল্ড হবার যোগ্য, কারণ স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসমতা ভাঙ্গনের দরুন এর সাম্যমান শূন্য নয়। (29) নং সমীকরণ থেকে দেখা যায় যে হিগস ফিল্ডের কোয়ান্টা হিগস বোসনের ভর
। CERN -এ সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে হিগস বোসনের ভর খুব সম্ভবত 125 GeV। অতীতের আরও কিছু পরীক্ষার ফল থেকে জানা ছিল যে
GeV। সুতরাং এই দুটি মান ব্যবহার করে
এবং
-এর মান নির্ণয় করে হিগস ফিল্ডের সমীকরণ লিখে ফেলা যেতে পারে। (26) নম্বর ল্যাগরেঞ্জিয়ান থেকে হিগস ফিল্ডের সমীকরণ,
বা,
হিগস ফিল্ড একটি স্কেলার ফিল্ড এবং হিগস বোসন একটি শূন্য স্পিন ও নির্দিষ্ট ভর যুক্ত কণা। এই হল হিগস ফিল্ড ও হিগস বোসনের সংক্ষিপ্ত রহস্য। তবে আমাদের আলোচনা খুবই প্রাথমিক স্তরের। পরবর্তিতে আরও বিশদে আলোচনা করতে পারব আশা করি। শেষ করার আগে বলে রাখি যে পরীক্ষাগারে হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন উচ্চশক্তি সম্পন্ন কণাদের পরষ্পরের সাথে সংঘর্ষ ঘটিয়ে হিগস ফিল্ডে আলোড়ন সৃষ্টি করা হয়। আর এই আলোড়নের কোয়ান্টাই হল হিগস বোসন। অতএব কণাদের পরষ্পরের সংঘর্ষে হিগস বোসন তৈরি হয় যা বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে সনাক্ত করা সম্ভব। উল্লেখ্য যে হিগস বোসনের গড় আয়ু খুব কম। মনে রাখবে মৌলিক কণাদের ভর সৃষ্টির কারণ হল হিগস ফিল্ড, হিগস বোসন নয়। আর হিগস বোসন শুধুমাত্র কয়েকটি মৌলিক কণাদের ভরের জন্যই দায়ী। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভর বা প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি যৌগিক কণাদের ভর কিন্তু শুধু হিগস বোসনের ফলে সৃষ্টি হয় না। হিগস বোসনের ভরের জন্যেও হিগস ফিল্ড সম্পূর্ণভাবে দায়ী নয়। এছাড়াও ডার্ক ম্যাটারের ভরও হিগস বোসনের ফলে হয় কিনা সেটা অজানা। তবে যেহেতু আমাদের পরিচিত সমস্ত ভরযুক্ত মৌলিক কণাদের ভরের জন্য দায়ী হিগস বোসন এবং পরমানুর গঠনে ওই মৌলিক কণাদের ভর অপরিহার্য, তাই হিগস বোসন আমরা যে বিশ্বব্রহ্মান্ড দেখতে অভ্যস্ত তার সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
অসাধারন লেগেছে । গাণিতিক যুক্তিগুলো দেখে ও বাংলায় বর্ণনা পড়ে বিষয়টি আরও ক্লিয়ার হলাম । 🙂
তবে একটা অনুরোধ কি রাখা যায় ?(যদিও এটা পদার্থ বিজ্ঞান না কিন্তু তারপরও বলছি ) যেহেতু পদার্থ বিজ্ঞানের উচ্চতর লেভেল এর বিষয় গুলোতে টেনসর ব্যবহৃত হয়(এবং আমাদের দেশে এমনকি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ও কোন টেনসরের আলচনা নেই), তাই ছোট করে টেনসরের উপরে একটা আরটিক্যাল লিখলে পরবর্তী অনেক পোস্টগুলো বুঝতে অনেক সহজ হয় ।
ধন্যবাদ
ধন্যবাদ মিঠুন। টেনসরের উপর একটা পোস্ট দেওয়ার সত্যিই যুক্তিযুক্ত, কারণ পদার্থবিদ্যায় টেনসর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আশা করছি শীঘ্রই ওটা লেখা সম্ভব হবে। 🙂
OSADHARON…. KONO PROSONGSAI JOTHESTO NOY…
বাহ্, অনেকদিন পর তোমার মন্তব্য দেখে খুব ভাল লাগলো সুজয়। 🙂
jotota pari up to date thakar chesta kori… Ar Tensor er upr ekta post pele khub e valo lagbe…dhonyobad
টেনসরের উপর পোস্ট লেখা চলছে। দু-একদিনেই পেয়ে যাবে আশা করছি।
জোসস (y)
হিগস ফীল্ডের উৎপত্তি কীভাবে , একটু বলবেন?
মহাবিশ্বের জন্ম লগ্ন থেকেই হিগস ফিল্ড বিদ্যমান। কিন্তু বিশ্বব্রহ্মান্ডের বয়স প্রায়
সেকেন্ড হওয়ার আগে হিগস ফিল্ডের সাম্যমান ছিল শূন্য। ওই সময় ব্রহ্মান্ডের তাপমাত্রা 100 GeV এর বেশি থাকায় হিগস ফিল্ডের সাম্যমান তাপমাত্রার প্রভাবে
থেকে
এর মাঝে খুব দ্রুত fluctuate করত। অর্থাৎ গড়ে হিগস ফিল্ডের সাম্যমান ছিল শূন্য। বিশ্বব্রহ্মান্ডের তাপমাত্রা 100 GeV এর থেকে কম হবার পর এটা উপরের পোস্টে আলোচিত
বা
এর মধ্যে কোন একটি সাম্যমান স্থায়ীভাবে গ্রহন করতে সক্ষম হয়, যার ফলে ইলেকট্রন, নিউট্রিনো ইত্যাদি মৌলকণাসমূহ তাদের ভর লাভ করতে পারে।
মিঠুন তোমার জন্যেও একটি প্রশ্ন, “জোসস” মানে কি?
!! আমি জানি না 🙁 । এটা কি কোন বিজ্ঞান রিলেটেড ওয়ার্ড বা বিষয় ?
আমিও জানিনা। একটা কমেন্টে দেখলাম একজন লিখেছে “জোসস (y)”, তাই তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম শব্দটার মানে কি? যাইহোক তুমি ফেসবুকে যে আর্টিকেলটা পাঠিয়েছিলে সেটা পড়েছি। ২০০৫ সালে আরেকজন চাইনীজ ভদ্রলোকও ওই একই কনসেপ্ট ব্যবহার করে একটি প্রবন্ধ ছেপেছিলেন, সেটার লিঙ্ক তোমায় পাঠাবো। পড়ে দেখ। তবে সাথে অবশ্যই সেই সাবধানবাণী, এগুলো মূলধারায় পদার্থবিদ্যায় স্বীকৃত বিষয় নয়।