ইনফাইনাইট কোয়ান্টাম ওয়েল (কূপ)

এতদিন আমরা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূল বিষয়গুলো আলোচনা করেছি। আজ আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রয়োগের একটি সহজ উদাহরণ দেব। মনে কর একটি বলকে গভীর কূপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল; নিউটোনিয়ান মেকানিক্স অনুসারে কিভাবে কূপের মধ্যে ফেলা হয়েছে তার উপর নির্ভর করে বলটির গতিশক্তির যেকোনো মান থাকতে পারে। গতিশক্তি শূন্যও হতে পারে; কূপের ব্যাসার্ধ ছোট কিংবা বড় করা হলেও বলের শক্তির কোন পরিবর্তন হয়না। কিন্তু যদি বলের বদলে একটি ইলেকট্রন বা অন্য কোন কোয়ান্টাম কণাকে (যার জন্য কোয়ান্টাম মেকনিক্স প্রযোজ্য) কূপের মধ্যে ফেলা হয়, তবে দেখা যায় যে ওর শক্তি কখওনই শূন্য হতে পারেনা; গতিশক্তির একটি সর্বনিম্ন মান সবসময়ই থাকে। শুধু তাই নয়, কূপের ব্যাসার্ধ যত ছোট করা হয়, কূপের মধ্যে অবস্থিত ইলেকট্রনের গতিশক্তি ততই বাড়তে থাকে। কোয়ান্টাম কণার এই  অদ্ভুত আচরনের কারণ হল হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি (একটু ভেবে দেখো) বা কণার তরঙ্গ ধর্ম। তবে এখানে উল্লেখ্য যে কোয়ান্টাম কূপের সাইজ অবশ্যই কণার দ্য ব্রোয়ী তরঙ্গদৈর্ঘের সমপর্যায়ের বা তার থেকে ছোট হতে হবে। আমরা আজ শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কূপ বা ওয়েলের মধ্যে অবস্থিত কণার ওয়েভ ফাংশন নির্ণয় করব। আর তোমরা জানো যে ওয়েভ ফাংশন থেকে ওই কণাটির গতি সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য (শক্তি, ভরবেগ ইত্যাদি) গণনা করা যায়। সুতরাং আজ তোমরা কোয়ান্টাম গতিবিদ্যার একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখতে পাবে।

ওয়েভ ফাংশন নির্ণয় করতে গেলে প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে ওয়েল বা কূপকে কিভাবে প্রকাশ করা হয়। সেজন্য কূপের মধ্যে বলের আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক। বলটিকে কূপের তলদেশে থেকে ওপরে নিয়ে আসতে হলে আমাদের কিছুটা শক্তি খরচ করতে হয়; অর্থাৎ কূপের বাইরে বলটির স্থিতিশক্তি কূপের ভেতরে ওর শক্তির থেকে বেশি। যদি বলের স্থিতিশক্তিকে (V(x)) দূরত্বের (x) ফাংশন হিসাবে গ্রাফ আ৺কা হয় তবে তা দেখতে এরকম হবে –

পোটেনশিয়াল ওয়েল
পোটেনশিয়াল ওয়েল

এই ছবিটিতে x-axis এ দূরত্ব এবং y-axis এ স্থিতিশক্তি বা পোটেনশিয়াল এনার্জি প্রকাশ করা হয়েছে। দেখতেই পাচ্ছ যে x = 0 এবং x=L এর মাঝে স্থিতিশক্তি শূন্য এবং তার বাইরে স্থিতিশক্তি খুব বেশি (এখানে যা অসীম বা infinite নেওয়া হয়েছে)। ছবি থেকে এটা পরিষ্কার যে কূপের পাশাপাশি দৈর্ঘ (গভীরতা নয়) L। কূপের গভীরতা অসীম বা infinite (স্থিতিশক্তির অক্ষে)। এরকম ধরনের অসীম গভীরতা সম্পন্ন পোটেনশিয়াল বা স্থিতিশক্তিকে বলা হয় ইনফাইনাইট পোটেনশিয়াল ওয়েল (কোয়ান্টাম ওয়েল)। যদি স্থিতিশক্তির অক্ষে ওয়েল বা কূপের গভীরতা সসীম বা finite হয় তবে তাকে ফাইনাইট পোটেনশিয়াল ওয়েল বলে। আজ আমরা শুধু ইনফাইনাইট ওয়েল নিয়েই আলোচনা করব। কূপের গভীরতা অসীম হলে কণার পক্ষে কখওনই ওর বাইরে বের হওয়া সম্ভব নয়; অর্থাৎ কূপের বাইরে কণাটিকে পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। তার মানে কূপের বাইরে কণার ওয়েভ ফাংশন হবে শূন্য। যদি ওয়েলের ভেতরে কণাটির ওয়েভ ফাংশন Psi(x) হয় তবে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণকে এভাবে লেখা যায়,

-\frac{\hbar^2}{2m}\frac{mathrm{d^2}Psi}{mathrm{d}x^2} + VPsi(x) = EPsi(x) ——— (1)

(যেহেতু কূপের ভেতরে পোটেনশিয়াল বা স্থিতিশক্তি সময়ের উপর নির্ভর করেনা, তাই আমরা সময় অনির্ভর শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ ব্যবহার করেছি।)

(1) নং সমীকরণে E কূপের মধ্যে কণাটির শক্তি, যা আমরা শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ থেকে নির্ণয় করব। যেহেতু কূপের মাঝে স্থিতিশক্তি শূন্য, তাই (1)  নং সমীকরণটি আরও সহজ হয়ে দা৺ড়ায়,

-\frac{\hbar^2}{2m}\frac{mathrm{d^2}Psi}{mathrm{d}x^2} = EPsi(x)

বা, \frac{mathrm{d^2}Psi}{mathrm{d}x^2} + k^2Psi(x)=0 ——————– (2)

যেখানে, k^2 = \frac{2mE}{\hbar^2}

(2) নং সমীকরণটি পদার্থবিদ্যায় অত্যন্ত পরিচিত সমীকরণ। ওটা সরল দোলগতির সমীকরণ যার সমাধান হল,

Psi(x) = Amathrm{sin}(kx) + Bmathrm{cos}(kx)    ——— (3)

লক্ষ্য কর যে সমাধানটিতে A, B ও k অজানা রাশি। এই রাশিগুলিকে বের করতে গেলে আমদেরকে কিছু শর্ত ব্যবহার করতে হবে। তোমাদের আগেই বলেছি যে কণাটি কূপের বাইরে বের হতে পারেনা। অর্থাৎ কূপের পরিধীতে এবং বাইরে কণাটির ওয়েভ ফাংশন শূন্য হতে হবে।

Psi(x=0) = 0 = Psi(x=L)

x = 0 তে Psi(x) = 0 -এই শর্তটি ব্যবহার করে আমরা পাই, B = 0। অতএব,

Psi(x) = Amathrm{sin}(kx)    ——— (4)

x = L তে Psi(x) = 0 -এই শর্তটি ব্যবহার করে আমরা পাই, mathrm{sin}(kL) = 0। তাহলে ত্রিকোণোমীতি থেকে তোমরা জানো যে, kL = npi, বা, k = npi/L, যেখানে n = 1, 2, 3…. ইত্যাদি একটি ধণাত্মক পূর্ণসংখ্যা। লক্ষ্য কর যে n এর মান শূন্য হতে পারেনা; কারণ তাহলে কূপের মধ্যেও ওয়েভ ফাংশন শূন্য হবে যা কিনা অসম্ভব (কেন?)।

সুতরাং, কূপের মধ্যে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণের সমাধান হল,

Psi(x) = Amathrm{sin}(npi x/L)    ——— (5)

অবশিষ্ট অজানা রাশি A -র মান নির্ণয় করার জন্য আমরা নর্মালাইজেশন কন্ডিশন ব্যবহার করব।

\int_0^L Psi(x)^*Psi(x) mathrm{d}x = 1

বা, A^2\int_0^L mathrm{sin}^2(npi x/L)mathrm{d}x = 1

বা, A^2 \frac{L}{2} = 1

বা, A = sqrt{2/L}। সুতরাং,

Psi(x) = sqrt{\frac{2}{L}}mathrm{sin}(npi x/L) —— (6)

চল এবারে কণাটির শক্তি নির্ণয় করা যাক। যেহেতু k^2 = 2mE/ \hbar^2, সুতরাং E = \hbar^2 k^2/2mk = npi/L ব্যবহার করলে আমরা পাই, E = \frac{n^2 \hbar^2 pi^2}{2 m L^2}। লক্ষ্য কর যে কণাটির শক্তি n -এর মানের উপর নির্ভর করে, যা কিনা একটি ধণাত্মক পূর্ণসংখ্যা। অর্থাৎ কূপের ভেতরে কণাটির শক্তি কন্টিনিউয়াস রাশি নয়; শক্তির শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট মানই থাকতে পারে (discrete variable)। এই ঘটনাকে পদার্থবিদ্যার পরিভাষায় বলা হয় যে কণাটির শক্তি কোয়ান্টাইজড। এছাড়াও আগেই দেখেছো যে n -এর ন্যূনতম মান হল 1; তাহলে কোয়ান্টাম ওয়েলের মধ্যে কণাটির শক্তির ন্যূনতম মান হল, E = pi^2 \hbar^2/2 m L^2। অর্থাৎ কোয়ান্টাম কূপের মধ্যে কণার গতিশক্তির একটি ন্যূনতম মান থাকে, যা কখওনই শূন্য হতে পারেনা। এটা পদার্থের তরঙ্গ বৈশিষ্টের প্রতিফলন। আরও লক্ষ্য কর যে ওয়েলের সাইজ L যত ছোট করা হবে, কণার গতিশক্তি তত বাড়বে। কোয়ান্টাম কণার এই বৈশিষ্টগুলো শুধু তাত্ত্বিক গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নয়; পরীক্ষাগারে কোয়ান্টাম ওয়েল তৈরী করা সম্ভব এবং দেখা যায় যে ওর মধ্যে কণার শক্তি সত্যিই কোয়ান্টাইজ্ড।

কোয়ান্টাম ওয়েলের মধ্যে কণার গতিশক্তির ন্যূনতম মান হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি থেকেও নির্ণয় করা যায়; তোমরা চেষ্টা করে দেখো।

আজ এপর্যন্তই রইল; ভালো থেকো ও পড়তে থাকো।

2 thoughts on “ইনফাইনাইট কোয়ান্টাম ওয়েল (কূপ)”

Leave a Reply to rifat Cancel reply

Your email address will not be published.